Writers Column



বিড়ম্বনা


অখন্ড অবসের ভাবলাম পরকীয়া নিয়ে একটা গল্প লিখি। বেশ রগরগে বর্ণনা যা পাঠক সমাজ লুফে নেবে। ইদানিং পত্র পত্রিকায় বিবাদ-বিচ্ছেদ,নারী নির্যাতন,পরকীয়া,স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নিগ্রহ এ সমস্ত খবর বেশ চাউর হচ্ছে। কাটতি বাডছে। এসবের একেবারে রমরমা অবস্থা । এ সমস্ত গল্প উত্তম পুরুষে লেখলে কেন যেন এখানে বাস্তবতার রং লেগে থাকে ।



গল্পের বর্ণনায় ধারাবাহিকতায় চোখে পানি আসে গেল। চরিত্রের সাথে মিলে যাওয়ার এ এক বিড়ম্বনা । কিভাবে আমার friendly foe (বন্ধু বেশী শত্রূ) মাসুদ সদালাপী বিনয়ের আবতারের একটা মডেল হিসেবে আমার সংসারে অনুপ্রবেশ করল, হৃদ্যতা স্থাপন করল। বর্নচোরা আম ও মাখানফলের সংমিশ্রনে গড়া এ চরিত্র আমার পেশাগত ব্যস্ততা ও ক্যালাস নেসের সুযোগে স্ত্রীর হৃদয়ের অন্তস্থলে দস্তক দিয়ে স্থান করে নিল । মাসুদের পাচঁ ফুট এগার ইঞ্চি দেহবয়বের তুলনায় আমার পাচঁ ফুট তিন ইঞ্চি দেহ আকৃতি দীর্ঘদিন পর কেমন যেন অকিঞ্চিৎকর বলে প্রতিভাত হলো । মাসুদের ঘন সন্নিবেশিত কাল ভুরুর কাছে আমার হাল্কা হয়ে আসা ভুরু তার দীঘল কাল চুলের তুলনায় আমার টাক মাথা । মাথার পেছনে চিরুনীর দাড়াঁর মত চুলের গোছা ইদানীং বড়ই বেমানান হতে লাগল । অবশেষে আমার দীর্ঘ দিনের সহচর স্ত্রী কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন চললাম । ব্রাউনিংয়ের “মাই লাস্ট ডাচেস” কবিতার কঠিনতম পাচঁটি শব্দের চেয়ে এ শব্দ অধিকতর বেদনাদায়ক হিসাবে আমার মনের মর্মমূলে আঘাত হানল । মাসুদের দীঘল দেহের পাশে তার নাতিদীর্ঘ অবয়ব পারমানবিক হলোকাস্টের মত বিধ্বংসী অবয়ব নিয়ে আমার দীর্ঘ দিনের সংসার তছনছ করে দিল । সেই গানের পংক্তিটি আমার বারবার মনে পরছিল “চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে আমার বলার কিছু ছিলনা”



প্রকাশকের টেবিল একগাদা পান্ডুলিপি ও নানাবিধ কাগজপত্রে ভরপুর । টাকা এবং শব্দ উভয়ের ব্যবহারে মিতব্যায়ী প্রকাশক গোল্ডেন রিমের চশমার ফাকেঁ আমাকে আপাদমস্তক পর্যবেহ্মন করলেন এবং হাত নেড়ে বসতে বললেন। ইদানিং আমার দেখা এবং লেখা দুটিই দুর্লভ বলে মন্তব্য করে হাত বাড়ালেন। সযত্নে রচিত পাণ্ডুলিপিটি তার হাতে তুলে দিলাম। বয়স্ক লোকেরা যেভাবে সকালে পত্রিকা পড়ে অনেকটা সেভাবে গভীরে অভিনিবেশ সহকারে আদ্যেপান্ত পরকীয়া গল্পটি তিনি পড়লেন। আমি ও গভীর মনযোগের সাথে তার মুখে ভাবলেশহিনতাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। অবশেষে তিনি মুখ তুললেন। তার অভিব্যাক্তি দেখে মনে হল গল্পটি তার পছন্দ হয়েছে। দার্শনিক শ্রেনীর মানুষ বেশি প্রশংসা তার ধাতে যায়না । লেখাটি সো সো আগামিকালের পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে। এ মর্মে আস্বস্ত করে তিনি আমাদের বিদায় করলেন । বের হওয়ার সময় তীর্যক চোখে খোঁচা মারলেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গন্ধ পাচ্ছি মশাই ।



পরদিন অফিস থেকে বাসাই যাওয়ার পথে ফোন বাজল । আরবী আধ্যাপক চাচা জানালেন চাচী আমাকে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন । আজকাল পর্দা পুশ্চিদার চল উঠে যাওয়ার কারনে সমাজে পরকীয়ার প্রসার সহ নানারকম অনাচার হচ্ছে চাচা জোরালো কন্ঠে জানালেন । আমি কোন মন্তব্য করলাম না ।



এরপর ফোন আসল আসিফের । আসিফ চিরকুমার । ওর বাসা দাম্পত্য কলহ পরবর্তী পুরুষদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত । ঝডের পুর্বাভাস দোস্ত । গেস্ট রুমটি করিমকে দিয়ে সাফসুতরো করে রাখছি । আমি আসিফের কথা হেসে উডিয়ে দিলাম। এর আগে পত্রিকায় একটা প্রেমের গল্প প্রকাশের পর স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্যের জের ধরে আসিফের ওখানে তিন দিনের আতিথ্য নিয়েছিলাম।



বাসার কাছাকাছি এসে ছোট বোনের উদ্বিগ্ন স্বরের ফোন পেলাম । সব ঠিকঠাক আছে তো দাদা ? তার কণ্ঠে উৎকণ্ঠার সাথে কিছুটা কৌতুহলের মিশেল । কেন সব কিছু ঠিকঠাক থাকবেনা তা আমার মাথায় তখনো আসেনি । অন্যমনস্কভাবে তাকে আস্বস্ত করলাম। প্রয়োজনে তার ওখানে খাওয়া দাওয়া করার জন্যে সে অনুরোধ জানাল ।



বাসার সামনে শিল্পপতি শ্বশুরের গাড়ী পার্ক করা দেখলাম। ঢোকার মুখে শ্বশুরের সান্তনা সূচক বাক্য কানে এল । দেখ এশা গল্প উপন্যাস বাস্তবতার ছোয়াঁচ আনতে গেলে বিভিন্ন চরিত্রের সাথে নিজেদের কে জড়ি্যে নিতে হয় এতে তো আমি দোষের কিছু দেখছি না , তুই এত খেপেছিস কেন ?



না বাবা তুমি বুজতে পারছ না ওর একগাদা বন্ধুবান্ধব। সারাক্ষন তাদের নিয়ে থাকে এবং ফষ্টি নষ্ঠি করে। সকাল থেকে লিপি, তিন্নি , বেলাদের ক্রমাগত ফোন আসছে। আমি বাসাই আছি কিনা । মাসুদ নামে কার ও সাথে আমার কোন এ্যাফেয়ার্স আছে কিনা-জবাব দিতে দিতে আমি হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি । আমাকে আজ একটা বিহিত ব্যাবস্থা করতে হবে ।



চোখেমুখে একটা নীরিহ ভাব এনে ঘরে ঢুকলাম । সঙ্গে সঙ্গে তোপের মুখ আমার দিকে ঘুরে গেল । তুমি আমাকে পেয়েছটা কি?এর আগে কাশেমের সাথে জড়িয়ে একটা গল্প ফেঁদেছিলে এবার একেবারে পরকীয়ার জালে গৃহ ত্যাগ। আমি কি সারাজীবন তোমার চরিত্র সৃষ্টির পরীক্ষাগারে থাকব? হাঁপাতে লাগল এষা। এক সময়ের তন্বী এষা মেদের কারণে বিপুল কলেবর হয়েছে অল্পে তার হাঁপ ধরে যায়। দেখ এষা আমি শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। চরিত্র চিত্রনে বা গল্পের প্রয়োজনে এ ধরনের ঘটনার বুনন হতে পারে এতে তোমার আপত্তির কি আছে আমি বুজতে পারছিনা। ঘরের কোনের ডিভান থেকে শ্বশুর এগিয়ে এলেন। একমাত্র মেয়ের সংসারের ঝাডঝাপটা সামলানোর গুরু দায়িত্ব তার স্কন্ধে ন্যস্ত শ্বাশুড়ীর এই আপ্ত বাক্য পালনে তিনি সদা তৎপর। সব তো বুঝলাম বাবা কিন্তু বারবার তোমার সাহিত্যের পরীক্ষা নিরীক্ষার পুতুল হতে হতে ওর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। তুমি তোমার লেখনীর প্যাটার্ন পরিবর্তন করলে ঝামেলার সুত্রপাত হয় না। শ্বশুরের কণ্ঠে আপোষের সুর। জগতের সমস্ত শ্বশুর শ্বাশুড়ীদের কন্যারত্নের প্রতি একপেশে মনোভাবে অন্তরে গভীর ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে নিরব থাকলাম । কিন্তু এষা আপোষের ধারে কাছেও গেলনা । শ্বশুরের অর্ন্তনিহিত প্রনোদনা তাঁকে আরও ক্ষেপিয়ে তুলল। আজ এর একটা হেস্ত নেস্ত করে ছাড়ব। আমি তোমার এটা চরিত্র চিত্রন। সাহিত্যের বলির পাঁঠা আর আমি হতে চাইনা। হয় লেখা বাদ দাও নতুবা আমাকে। লেখনী আমার জীবিকা যোগায়। জীবনের সাথে জীবিকার নিবিড় সম্পর্ক তাকে বাদ দিই কিভাবে। ঈশপের গল্পের ভালু্কের নীতিবাক্যের সুত্র ধরে আসিফের চেহারাটা মনের মানসপটে ভেসে উঠল। চুপচাপ নিজের কামরায় ঢুকে স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাপড চোপড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ঘুচিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলাম। আমার অগ্রসরমান পায়ের আওয়াজ ও দরজা বন্ধের মৃদু শব্দের সম্মিলন উৎকন্ঠিত শ্বশুর ও  বাকরুদ্ধ স্ত্রীকে অর্থবহ বার্তা পাঠাল।


Comments

Leave a Replay

Make sure you enter the(*)required information