চুনতির পোতন সিকদার বংশ ও তাঁর বংশের চার পুরুষ কাল

ওয়াহিদ আজাদ



লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রাম ইতিহাসের পাতায় শিক্ষা দীক্ষায় সমৃদ্ধশালী একটি গ্রাম। এই গ্রামে জন্ম নেওয়া প্রাণপুরুষদের কর্মের ফলে ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশেও একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম হিসেবে সুনাম অর্জন করে। এই গ্রামটি শিক্ষার পরিমণ্ডলে একটি অনন্য গ্রাম হিসেবে এর সুনাম দেশ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। ২০০ বছরেরও কিছু সময় আগে থেকেই এই এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন হয়েছিল। চুনতির সবচেয়ে প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন চুনতি হাকিমিয়া কামিল(এম. এ) মাদ্রাসা নামে পরিচিত। এই মাদ্রাসা মানের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপর্যায়ে পৌঁছে গেছে অনেক আগে। দেশের মাদ্রাসাগুলোতে স্নাতক(সম্মান) কোর্স চালু হওয়ার শুরু থেকেই এই মাদ্রাসায় সরকারিভাবে স্নাতক(সম্মান) কোর্স চালু হয়েছে। চুনতিতে যুগে যুগে বহু গুণীজন, সুফি, সাধক, পীর আউলিয়ারা জন্ম নিয়েছেন। যাঁদের হাত ধরেই মূলত চুনতি জনপদ সমৃদ্ধ হয়েছে। এখনো শিক্ষায় অগ্রগতির দিক দিয়ে অনেক শহরও এই একটি গ্রামের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এঁদের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন ইতিহাস তাঁদেরকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। চুনতির প্রতিটি মানুষের বুকে এখন এই গুণীজনরা প্রতিটি ঘরে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্ঞানার্জনের নেপত্যে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে এই গ্রাম এখনো বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রাম থেকে বহুগুণে সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই এলাকায় জমিদার শ্রেণির মানুষদের বসবাস। তেমনই একজন জমিদার চুনতিতে জন্ম নিয়েছেন। সময়ের পরিক্রমায় হয়তো চুনতির এই প্রাণপুরুষের বংশ পরিচয়ের কথা ইতিহাসে ছাপা হয়নি। তবে আজকে উনার বংশের ইতিহাস আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। ঊনবিংশ শতাব্দীতে চুনতির বুকে জন্ম নেওয়া এক প্রাণপুরুষের নাম পোতন সিকদার (বশির আহমদ)। এই মানুষটির পরে আরো দু’টি প্রজন্ম ইতিমধ্যে গত হয়েছেন। পোতন সিকদারের দুই প্রজন্ম পরের প্রজন্ম এখন জীবিত আছেন। মূলত পোতন সিকদারের বংশের পরবর্তী তৃতীয় প্রজন্মের কাছেই তথ্য সংগ্রহ করে লেখাটি প্রকাশ করছি (ওয়াহিদ উদ্দিন আজাদ নিবন্ধটির লেখক ও বর্ণনাকারী)। নিবন্ধটি মূলত: আত্মীয়-স্বজন, পারিবারিক শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসী তরুণ প্রজন্ম যারা ইতিহাস জানতে আগ্রহী তাদের সৌজন্যে নিবেদিত।
 
পোতন সিকদার (বশির আহমদ) (১৮৭০-১৯০৫/১৯১০):
 
চুনতি সিকদার পাড়ার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে পোতন সিকদার (বশির আহমদ) আনুমানিক ১৮৭০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পোতন সিকদারের বংশের সাথে চুনতির আরো কিছু নাম করা বংশের সাথে আত্মীয়তা ছিলো। তিনি বিংশ শতকের শুরুতে “চুনতি” ও পারিপার্শ্বিক অঞ্চলের একাংশের জোতদার/ভূ-স্বামি ছিলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে তিনি বৃহত্তর চুনতিসহ উত্তর চকরিয়ার আনুমানিক হাজার একর জমি-জমার অধিকারী ছিলেন ; তিনি এতদঞ্চলের সমকালীন খান বাহাদুর হাসান সাহেবের বোন রমিজা খাতুনকে বিয়ে করেন। উল্লেখ্য, খান বাহাদুর হাসান হারবাং এর তৎকালীন মন্ত্রী খান বাহাদুর জালাল উদ্দিনের বোনকে বিয়ে করেছিলেন (আমার দাদা-দের মামি)। সমকালীন অপর সহযোগী মুন্নু মিয়া প্রথাগত জমিদারিত্ব চালিয়ে গেলেও, পোতন সিকদার অনেক ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন। শোনা যায়, প্রজাদের প্রতি তাঁর আচরণ ন্যায়সিদ্ধ ছিল না, যদিও অল্প বয়সে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এসব কারণে তিনি তাঁর দুই ছেলে “ওয়াদুদ শিকদার”, “সুলতান আহমেদ” (আমার দাদা) ও তিন মেয়েকে যত্নসহকারে প্রতিপালন করতে পারেননি।
 
পোতন সিকদারের এক মেয়ের ঘরের নাতনী জামাই ছিলেন চুনতি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইসাহাক মিয়া ( ইসমাইল মানিক ভাই ও প্রয়াত মেজর জেনারেল জয়নাল আবেদীন, বীর বিক্রম এর বাবা)।
 
পোতন সিকদারের মেয়ের ছেলেরা হলেন বদর আমিন (নুরুল হুদা/কমরু/নজরুল ভাই-দের বাবা), মৌলভী আক্তার (সারোয়ার/আনোয়ার ভাই, ডা: সেহেলি আপা-র বাবা), মৌলভী ওসমান গনি (ডা: আব্দুস সালাম আবু/ডা: মজিদ-দের বাবা) প্রমূখ ; তাদের দু’জন ভাগ্মে শ্রদ্ধাভাজন ধর্মীয় ব্যাক্তিত্ব মরহুম মৌলভী আবেদ (প্রফেসর জাহেদ/পুলিশ সুপার তালেব-দের বাবা) ও আধ্যাত্বিক ব্যাক্তিত্ব মৌলভী ফজল।
 
পোতন সিকদার বিখ্যাত খান বাহাদুর হাসান সাহেবের বোনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। খান বাহাদুর সাহেবের এক ভাতিজি বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাবেক ছাত্রনেতা এরশাদুল হক ও আমাদের খালু জহিরুল হক-দের মা ও শেহজাদ ভাইদের দাদী (খান বাহাদুর সাহেবের ভাতিজি)। পোতন সিকদারের আরেক মেয়ে চুনতির বিশিষ্ট ইসলামী ব্যাক্তিত্ব হাফিজুল হক খোকন ভাই এর দাদী হন।
 
পোতন সিকদারের দুই ছেলের মধ্যে প্রথম সন্তান “ওয়াদুদ সিকদার” পিতার অবর্তমানে জমিদারিত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পারিবারিক ঐতিহ্যের শেষ ধারক ও বাহক ছিলেন। তবে তিনিও পূর্বপুরুষদের মত অদূরদর্শী, বদমেজাজি ও খামখেয়ালী ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে ছিল। ছেলেরা যথাক্রমে মরহুম মাহফুজুর রহমান (মওদুদের বাবা) ও মরহুম হারুনুর রশিদ (হেলাল/জুনায়েদের বাবা)। বড় ছেলে মরহুম মাহফুজুর রহমান এর স্ত্রী প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও সুরকার নকীব খানের খালা ছিলেন। ওয়াদুদ সিকদারের এক মেয়ে-জামাই স্বনামখ্যাত মরহুম “মুফতি ইব্রাহিম” সাহেব (মোহাম্মদ ভাই এর বাবা)। পোতন সিকদার সম্ভবত ১৯০৫-১৯১০ এই সময়ের মধ্যে ইন্তেকাল করেন।
 
পোতন সিকদারের পরবর্তী প্রজন্ম (দ্বিতীয় পুরুষ কাল):
 
পোতন সিকদারের কনিষ্ঠ সন্তান সুলতান আহমেদ জমি-জমার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না অথবা এমনও বলা হয়ে থাকে যে তাঁর বড় ভাই ওয়াদুদ সিকদার সংগত কারণে তা চাইতেন না। ওয়াদুদ সিকদারের ইচ্ছায় ও নিজ আগ্রহে সুলতান আহমেদ পড়াশোনায় মনোযোগী হন। ১৯১৫ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাতকানিয়া এইচ ই উচ্চ বিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিকুলেশন ও ১৯১৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ হতে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমেডিয়েট পাস করেন। ছাত্রাবস্থায় তাকে দীর্ঘদিন ঘরের বাইরে অবস্থান করতে হয়েছে। ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেই তিনি ১৯১৮/১৯ সালে বিভিন্ন সরকারি চাকুরীর জন্য আবেদন করেন (ডিগ্ৰী-তে ভর্তি হলেও অজ্ঞাত কারণে পড়াশুনা চালিয়ে যাননি)। এরমধ্যে পুলিশের ইন্সপেক্টর পদটি অন্যতম ছিল, তবে তিনি কোন কারনে এ পদে যোগ দেননি বলে জানা যায়। পরবর্তীতে কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে স্থানীয় মাদ্রাসায় খন্ডকালিন শিক্ষকতা করত: ১৯২৩ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েতে “জুনিয়র স্টেশন অফিসার” পদে যোগ দেন। রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে তিনি আসাম, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। তিনি বরাবরই একজন স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন, এ কারণে বোধহয় বেশিদিন রেলওয়েতে চাকরি করেননি। কয়েক বছর পরেই তিনি চুনতি গ্রামে ফিরে আসেন এবং স্থানীয় মাদ্রাসায় শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। এ সময় তিনি গ্ৰামের উন্নয়নমূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত হন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের তৎকালীন “ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট” তাকে “চুনতি ওয়ার্ড & ওয়াচ কমিটি”র মেম্বার নিয়োগ দেন।
 
সুলতান আহমেদ ১৯২১ সালে সাতকানিয়ার ঐতিহ্যবাহী “দারোগা বাড়ী”র হাসমত দারোগার মেয়ে “লুৎফুল আমদাম”কে (আমাদের দাদী) বিয়ে করেন। লুৎফুল আমদামের নানা বাড়ি যশোর শহরে ছিল। লুৎফুল আমদামেরা ৫ বোন ও ৪ ভাই। এক ভাই কছির উদ্দিন তৎকালীন পাকিস্তান আমলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম সারির একজন এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন । আরেক ভাই সৈয়দ রফিক উদ্দিন আহমেদ ঢাকা কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ছিলেন । পরবর্তীতে তিনি টাঙ্গাইলস্থ “করটিয়া সাদত হোসেন কলেজে”র অধ্যক্ষ হন ( ওনার এক ছেলে বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক সালাউদ্দিন জাকী)। অপর ভাই নাসির উদ্দিন পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট (এসপি) ছিলেন। সুলতান আহমেদ এর স্ত্রী লুৎফুল আমদামের এক ভাই এর মেয়ে ডা: হোসনে আরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক “পরিচালক” (‘৯০/৯১ সাল) ও আরেক ভ্রাতুস্পুত্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক রেজিষ্ট্রার মরহুম ডা: মাহাতাব উদ্দিন। উনার অপর এক বোনকে চুনতি ‘কাজী পরিবারে’ বিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি পোতন সিকদার এর নাতনী জামাই ফখরুদ্দীন (জেসমিন আপা, কাজী শাহেদ-দের বাবা) ও জ্যাঠা সাবেক থানা শিক্ষা অফিসার রইস উদ্দিন-দের মা।
 
জমি-জমার প্রতি সুলতান আহমেদের বিশেষ আগ্রহ না থাকলেও পৈত্রিক সূত্রে তিনি প্রচুর জায়গা- সম্পত্তির অধিকারী হন। শোনা যায়, বর্তমান চুনতি অভয়ারণ্যের বড় একটি অংশ এবং চকরিয়া উপজেলার আজিজ নগরস্থ রমনা সিগারেট কারখানার জমি পোতন সিকদারের মালিকানাধীন ছিল। পরবর্তীতে পঞ্চাশের দশকে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে পরিবারটির অনেক সম্পত্তি দেউলিয়া ঘোষিত হয়। বাকি অনেক সম্পত্তি খাজনা না দিতে পারার কারণে কিংবা দুরাবস্থার সুযোগে এলাকার  কিছু স্বার্থাণ্বেষী ও সুযোগ-সন্ধানী ব্যাক্তি ছলে-বলে কৌশলে হস্তগত করে নেয়। সূত্রমতে, এখনো চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চুনতি-চকরিয়া সীমানার দুই পাশে বিস্তীর্ণ জমির মালিকানা বর্ণিত পোতন সিকদার ও তার দুই ছেলে। সুলতান আহমেদ ১৯৫৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
 
সুলতান আহমেদ পরবর্তী প্রজন্ম (তৃতীয় পুরুষকাল):
 
সুলতান আহমেদের ৭ কন্যা ও ১ পুত্র (বর্তমানে তাঁর মেয়ে জেসমিন ও কাজী শাহেদ-দের মা ‘লায়লা’ জীবিত রয়েছেন, অন্যান্য মেয়েরা সকলেই মারা গিয়েছেন)। উল্লেখযোগ্য ফুফাদের মধ্যে বড়জন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব কাজী আব্দুল বাসেত দুলাল ভাই এর বাবা, একজন পতেঙ্গাস্থ সিভিল এভিয়েশনের সাবেক স্টোর অফিসার, একজন ওয়াপদার কর্মকর্তা (পরবর্তীতে চাকুরী ছেড়ে দেন), একজন ব্যবসায়ী ও ঢাকায় নওয়াব পরিবারের সুপারিনটেনডেন্ট এবং অপর জন শিক্ষক ছিলেন।
 
সুলতান আহমেদের একমাত্র পুত্র আফতাব উদ্দিন। আফতাব উদ্দিন ১৯৩৭ সালে চুনতিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার অনুসরণে স্থানীয় চুনতি হাকিমিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম শহরস্থ ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজ (বর্তমানে যাহা মহসিন কলেজ হিসেবে পরিচিত) হতে “মেধা তালিকায়” (মানবিক) স্থানপূর্বক প্রথম বিভাগে ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ভালো ফলাফল করার কারণে তিনি “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে”র অর্থনীতি বিভাগে (সন্মান) বিশেষ বৃত্তি সহকারে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। তবে তিনি পিতা সুলতান আহমেদের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি (পরবর্তীতে পারিপার্শ্বিক দুরবস্থার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয়নি)। জানা যায়, দক্ষিণ চুনতি নিবাসী সম্ভবত জনৈক ফশিউর রহমান ওই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। পরে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হয়েছিলেন (ফসিউর রহমান ১৯৯৩/৯৪ সালে একবার আমাদের বন্দর এলাকার বাসায় এসেছিলেন এবং মনে পড়ে তিনি বলেছিলেন যে আমার বাবা দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভর্তি হতে না পারায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগটি পেয়েছিলেন)। আফতাব উদ্দিন পরে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ হতে বিএ এবং কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ হতে বিএড পাস করেন। চাকুরী জীবনে তিনি চকোরিয়ার বদরখালীস্থ স্থানীয় সমবায় সমিতি পরিচালিত একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরে ১৯৬১-৬৭ অবধি চট্টগ্রামস্থ আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন যাতে সৎ ও সাধারণ জীবন যাপন করতে পারেন। বন্দর স্কুলে শিক্ষকতার কোনো এক পর্যায়ে তিনি ও অপর সহযোগী শিক্ষক চুনতি নিবাসী মরহুম এশফাক হোসেনকে (সম্পর্কে আমার বাবার ভ্রাতুস্পুত্র ও ডা: ওয়াজাহাত হোসেন দুলু/চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমরান হোসেন হুমায়ুন-দের ভাই ; তাঁর বাবা মৌলভী নুরুল হোসেন কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার গোল্ড মেডেলিষ্ট ছিলেন) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বন্দরের পরিবহন বিভাগের ‘কর্মকর্তা’ পদে যোগদানের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা তারা শ্রদ্ধাভরে ফেরত দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তিনি সততা ও নিষ্ঠার জন্য যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমনি মেজাজি মনোভাবের কারণেও কোন কোন ক্ষেত্রে সমালোচিত ছিলেন। উল্লেখ্য, আফতাব উদ্দিন তাঁর পরিবার নিয়ে দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট এলাকায় বসবাস করেন। সে সূত্রে অত্র এলাকায়ও তাঁর পারিবারিক পরিচিতি ও স্থানীয় সবার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।
 
আফতাব উদ্দিন ১৯৬০ সালে লোহাগাড়া থানার স্বনামখ্যাত “শরীয়ত উল্লাহ মুন্সির” মেয়ে নুরুন্নাহার বেগম কে বিয়ে করেন। শরীয়তুল্লাহ মুন্সি একজন ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধি ছিলেন। লোহাগাড়া ও কক্সবাজার এলাকায় তাঁর প্রচুর সহায়-সম্পত্তি ছিল। কক্সবাজার শহরের প্রাচীনতম আবাসিক হোটেল “বলাকা হোটেল” তাঁর প্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও বদরখালী অঞ্চলে লবণ ও চিংড়ির ঘের ছিল। তিনি এক সময় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোনীত হয়েছিলেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামে “পরিবহন ব্যবসা” চালুর বিষয়ে তিনি একজন পথিকৃৎ উদ্যোক্তা । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কয়েকটি ট্রাক কিনে নিয়ে তিনি এ ব্যবসার গোড়াপত্তন করেন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের আমিরাবাদ নামক স্থানে অবস্থিত বর্তমান “বটতলী” স্টেশনটি প্রতিষ্ঠায় শরীয়তুল্লাহ মুন্সির অবদান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি একজন বন্ধুবৎসল এবং বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। এ কারণে নিজের মেয়েদের বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি আর্থিক সচ্ছলতা বিবেচনা না করে শিক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মরহুম শরিয়ত উল্লাহ মুন্সির বড় জামাতা মরহুম আব্দুল হালিম একজন শিক্ষক, এরপর দ্বিতীয় জামাতা মরহুম আফতাব উদ্দিন একজন শিক্ষক, তৎপরবর্তী জন মরহুম শামসুল হক বিসিআইসির সিনিয়র প্রকৌশলী ; অপর একজন মরহুম আলম কাস্টমসের কর্মকর্তা ছিলেন (পরবর্তীতে পরিবহন ব্যবসায় জড়িত হন), আরেকজন ব্যবসায়ী এবং সর্বশেষ জন চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক কর্মকর্তা (চুনতির খান বাহাদুর সাহেবের নাতি জহিরুল হক)।
 
মরহুম শরিয়ত উল্লাহর ৮ ছেলে সন্তানের জনক। তাদের মধ্যে ৪ জন গত হয়েছেন। শরীয়তউল্লাহ মুন্সির ছেলেরা স্ব স্ব ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন (মূলত: ব্যবসা)। শরীয়তুল্লাহ মুন্সির বড় ভাই মাহফুজুল্লাহ একজন আধ্যাত্বিক পুরুষ  ছিলেন। তাঁর এক ছেলে “ডা: সিরাজ উদ্দিন” পাকিস্তান আমলের এমবিবিএস চিকিৎসক এবং অপরজন “নাজিম উদ্দিন” (স্বাধীনতা-পূর্ব কালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা ও ভিপি) সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। ভ্রাতুস্পুত্রদের উচ্চ শিক্ষা গ্ৰহনে শরীয়তুল্লাহ মুন্সির বিশেষ অবদান ছিল। মাহফুজুল্লাহ বহুল পরিচিত ‘সৌদিয়া পরিবহন’ ও মোস্তফা গ্রুপের মালিক মোস্তাফিজুর রহমানের বোনকে বিয়ে করেন।
 
৬ অক্টোবর ২০১২ সালে পোতন সিকদারের বংশের তৃতীয় প্রজন্মের জনাব “আফতাব উদ্দিন” ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন পারিবারিক ও সামাজিক যুগ-সন্ধিক্ষণের চিরায়ত এক পথযাত্রী। স্থানীয়ভাবে একটি প্রাচীন, সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পরিবারের জীবন-যাত্রা সহজ ছিল না। চুনতি গ্রামের কোন কোন মুরুব্বি বলতেন তাঁর পরিবার নাকি স্বীয় কয়েকজন পূর্বপুরুষের কিছু কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করছিল। একারণে নিয়তি তাকে ও তাঁর পরিবারকে (আমাদের) কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
 
একটি সংকটময় যুগ-সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি ছিল আফতাব উদ্দিনের পরিবার। চুনতির বিশিষ্ট ও ঐতিহ্যবাহী ‘ডেপুটি বাড়ি’ পরিবারের সদস্যদের মতো পোতন সিকদারের পূর্বপুরুষেরাও এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী, প্রাচীন পরিবার (আনুমানিক দু’শতাধিক বছরের পুরনো) বিবেচনায় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারতো। মূলত: কিছু পূর্বপুরুষের অদূরদর্শিতা, খামখেয়ালীপনা, আত্ম-অহংকার ও উগ্র মেজাজের কারণে তা সম্ভবপর হয়নি (তবে দুঃখজনকভাবে তাদের কিছু ‘ইতিবাচক’ কর্মকাণ্ড কিংবা অবদান সমসাময়িক কালের বিভিন্ন আলোচনায় প্রতিফলিত হয়নি বরং নানাভাবে তা উহ্য রাখা হতো, যে কারণে কালের পরিক্রমায় এগুলো হারিয়ে যায়)। এমন পারিবারিক যুগ-সন্ধিক্ষণ মুহূর্তে এই পরিবারের অন্যতম প্রাণপুরুষ আফতাব উদ্দিনের ঘরে সকলের মমতাময়ী, শ্রদ্ধাভাজন অর্থাৎ ‘সিকদার বাড়ি’র বউ হিসেবে এসেছিলেন নুরুন্নাহার বেগম এবং প্রায় ৬০ বছর যাবৎ অত্র গ্রামের একজন সাধ্বী, নমনীয় ও খোশমেজাজী অথচ দৃঢ়চেতা মনোভাবাপন্ন ও অতিথি পরায়ণ গৃহবধূ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, যা তাঁর মৃত্যুকালে গ্রামের বাড়িতে আসা এলাকার সাধারণ পরিবারের পুরুষ-মহিলা সদস্যদের প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছিল।
 
গত ১৪ মার্চ ২০২১ ইং তারিখে আফতাব উদ্দিন এর সহধর্মিণী সর্বজন শ্রদ্ধেয়া মমতাময়ী “নুরুন্নাহার বেগম” এর ইন্তেকাল করেন।
 
আফতাব উদ্দিন এর পরবর্তী প্রজন্ম (চতুর্থ পুরুষ কাল):
 
আমরা ৫ ছেলে ও ২ মেয়ে , শামসুদ্দিন পারভেজ, শাহনাজ সুলতানা শেলী, কফিলউদ্দিন লিটু, শহীদ উদ্দিন শহীদ, ওয়াহিদ উদ্দিন আজাদ, ফারহাত সুলতানা শিল্পী ও মোছলেহ্উদ্দিন জিকু। আমরা সকলেই আমাদের মতো প্রতিষ্ঠিত আলহামদুলিল্লাহ।
 
মূল লেখক: ওয়াহিদ উদ্দিন আজাদ
সম্পাদনায়: এম. তামজীদ হোসাইন
 
(সূত্র: প্রবীণ জাফর মাস্টার, লেখকের জ্যাঠাতো নুরুল হুদা, মরহুম ওসমান গনি জ্যাঠা, খুরশিদ চাচা, মরহুম হারুন চাচা, আব্দুল বাসেত দুলাল ভাই, আলমগীর ভাই, বাবা-মা ও বিভিন্ন সময়ে আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক দেয়া বর্ণনা ও কিছু দলিল পত্র)।

 




Comments

Leave a Replay

Make sure you enter the(*)required information