শুরুর কথামামাকে নিয়ে লিখব, এই কথাটা বহুদিন ধরে মনের ভেতরে ঘুরছিল। কিন্তু যতবার কলম ধরেছি, ততবার থেমে গেছি। কোথা থেকে শুরু করব, কতটুকু বলব, আর কোনটা বললে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে, এই ভাবনাগুলো আমাকে আটকে রেখেছিল।চুনতির মানুষ তাঁকে চেনেন পীর সাহেব হিসেবে। অনেকের কাছে তিনি হযরত শাহ মাওলানা হাবীব আহমদ (রহ.), একজন বড় আলিম, মাদরাসার অধ্যক্ষ, মসজিদের খতিব। কিন্তু আমার কাছে তিনি প্রথমে মামা। তারপর তিনি আমার উস্তায, আমার রাহবার, আমার অভিভাবক। একজন মানুষের মধ্যে এতগুলো সম্পর্ক একসঙ্গে মিশে থাকলে তাঁকে নিয়ে লেখা সহজ থাকে না।মামা ডাকটার ভেতরে একটা আপন আপন ভাব আছে। মায়ের ভাই, তাই রক্তের টান তো আছেই। আবার উস্তায শব্দটা উচ্চারণ করলেই মনে হয়, তাঁর কাছে আমার একটা ঋণ আছে, যা কোনোদিন শোধ হবে না। রাহবার বললে মনে পড়ে, জীবনের নানা মোড়ে তিনি কিভাবে পথ দেখিয়েছেন। আর অভিভাবক শব্দটায় আছে এক ধরনের নির্ভরতা, মাথার ওপর একটা ছায়ার মতো।এই লেখা কোনো গবেষণাপত্র নয়। আমি এখানে তাঁর জীবনের বিচার করতে বসিনি। আমি শুধু আমার চোখে দেখা, আমার মনে জমে থাকা একজন মানুষের কথা বলতে চাই। তাঁর জীবনের যেসব তথ্য প্রকাশিত লেখায় পাওয়া যায়, সেগুলো আমি সাবধানে ব্যবহার করেছি। যেখানে নিশ্চিত তথ্য নেই, সেখানে আমি অনুমান করে কিছু বসাইনি।কেন এই সাবধানতা? কারণ মামা নিজেই ছিলেন সত্যের ব্যাপারে খুব যত্নশীল মানুষ। তাঁর নামে এমন কিছু বলা, যা তিনি বলেননি বা করেননি, সেটা তাঁর প্রতি ভালোবাসা নয়, বরং অবিচার। আমি চাই, তাঁকে যেমন ছিলেন তেমনভাবেই মনে রাখা হোক।আরেকটা কারণেও লিখছি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো তাঁর নাম শুনেছে, কিন্তু তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়নি। তাদের জন্য একটা জানালা খুলে দিতে চাই, যাতে তারা দেখতে পায়, একজন আলিম কিভাবে সারাজীবন জ্ঞান, আমল আর মানুষের সেবায় কাটিয়ে দিতে পারেন।লেখাটা আমি সাজিয়েছি তাঁর জীবনের ধারা ধরে। প্রথমে চুনতি আর তাঁর পরিবার, যেখান থেকে তাঁর যাত্রা শুরু। তারপর শিক্ষক আর অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন। এরপর আলিম, কুরআনের মানুষ আর মুর্শিদ হিসেবে তাঁর পরিচয়। তারপর মসজিদ, মাদরাসা আর সমাজে তাঁর ভূমিকা। শেষে আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, আর তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো। পড়তে পড়তে কেউ যদি একটু থেমে নিজের জীবনের দিকে তাকান, তাহলেই মনে করব, লেখাটা সার্থক হয়েছে।চুনতি: যেখানে শিকড়মামাকে বুঝতে হলে আগে চুনতিকে একটু বুঝতে হয়। চুনতি শুধু একটা গ্রামের নাম নয়। এখানে বহু প্রজন্ম ধরে দ্বীনি শিক্ষা, আধ্যাত্মিক সাধনা আর সামাজিক নেতৃত্বের একটা ধারা বয়ে চলেছে। মসজিদ, মাদরাসা, আলিমদের মজলিস, ধর্মীয় সমাবেশ, এসব মিলে এখানকার মানুষের জীবন গড়ে উঠেছে।ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, চুনতিতে আলিমদের প্রতি মানুষের একটা আলাদা শ্রদ্ধা আছে। কেউ বড় আলিম হলে গোটা এলাকা তাঁকে নিয়ে গর্ব করে। তাঁর কাছে মানুষ আসে মাসআলা জানতে, পরামর্শ নিতে, দু'আ চাইতে। কখনো পারিবারিক ঝামেলা মেটাতে, কখনো শুধু দুটো ভালো কথা শুনতে।এই পরিবেশে বড় হওয়া মানুষের জীবনে দ্বীন আলাদা কোনো বিষয় হয়ে থাকে না। সকালে ফজরের আজান, মক্তবে কুরআন শেখা, মাদরাসার ঘণ্টা, জুমার খুতবা, এসব দিনের স্বাভাবিক ছন্দের অংশ। মামা এই ছন্দের ভেতরেই জন্মেছেন, বেড়ে উঠেছেন, আর পরে নিজেই সেই ছন্দের একজন ধারক হয়ে উঠেছেন।চুনতি হাকিমিয়া মাদরাসা এই এলাকার দ্বীনি শিক্ষার একটা বড় কেন্দ্র। বহু ছাত্র এখান থেকে পড়াশোনা করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ শিক্ষক হয়েছে, কেউ ইমাম, কেউ খতিব, কেউ অন্য পেশায় গিয়েও দ্বীনের আলো বয়ে নিয়ে গেছে। মামার জীবনের বড় একটা অংশ এই মাদরাসাকে ঘিরেই কেটেছে।আমি যখন চুনতির কথা ভাবি, তখন মামার মুখটাই আগে ভেসে ওঠে। মনে হয়, তিনি যেন এই জায়গার একটা প্রতীক ছিলেন। তাঁর মধ্যে চুনতির শিক্ষা, শালীনতা, ধৈর্য আর মানুষের প্রতি টান সব একসঙ্গে দেখা যেত।তবে একটা কথা আমি বিশ্বাস করি। জায়গা মানুষকে গড়ে, আবার মানুষও জায়গাকে গড়ে। চুনতি মামাকে যেমন তৈরি করেছে, মামাও তেমনি সারাজীবন চুনতির শিক্ষা আর ধর্মীয় পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খেটেছেন। তাঁর জীবনের গল্প তাই চুনতিরও গল্প। আর সেই কারণেই তাঁকে নিয়ে লিখতে বসলে চুনতির মাটি, মসজিদ আর মাদরাসার কথা বারবার চলে আসে।আজ চুনতিতে গেলে অনেক কিছু বদলে যাওয়া চোখে পড়ে। রাস্তা পাকা হয়েছে, নতুন দালান উঠেছে, মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। কিন্তু আজানের সুর, মাদরাসার পথে ছাত্রদের সারি, মসজিদের ভেতরের নীরবতা, এসব এখনো আগের মতোই মনে হয়। আর এই না-বদলানো জিনিসগুলোর মধ্যেই আমি মামার উপস্থিতি অনুভব করি। মনে হয়, তিনি যে পরিবেশ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, তার ভিতটা এখনো মজবুত আছে।শাহ ছূফী মওলানা নযীর আহমদের ঘর, মামার বেড়ে ওঠামামার বাবা ছিলেন মাওলানা শাহ ছূফী নযীর আহমদ (রহ.)। আমার নানা। প্রকাশিত জীবনী-বিবরণে এই পরিচয়টা স্পষ্টভাবে আছে, আর আমাদের পরিবারে তো এটা সবারই জানা। নানার ঘর ছিল দ্বীনি শিক্ষার ঘর। চুনতি হাকিমিয়া মাদরাসার সঙ্গে এই পরিবারের সম্পর্ক বহু পুরোনো।এমন ঘরে বড় হলে একটা শিশু অনেক কিছু শেখে, যা কেউ বসিয়ে পড়ায় না। সে দেখে, বাড়ির বড়রা কিভাবে ভোরে উঠে নামাযে দাঁড়ান। দেখে, কিতাবের প্রতি তাঁদের কি গভীর মমতা। দেখে, উস্তাযের নাম উচ্চারণের সময় গলার স্বর কিভাবে নরম হয়ে আসে। দেখে, দরজায় কেউ সাহায্য চাইতে এলে তাঁকে কিভাবে বসতে দেওয়া হয়।মামার শৈশবের খুঁটিনাটি আমি নিজে জানি না। তাঁর জন্মসাল, প্রথম কোন উস্তাযের কাছে পড়েছেন, শিক্ষাজীবনের পুরো ধারাবাহিকতা, এসবের নির্ভরযোগ্য বিবরণ আমার হাতে নেই। তাই আমি এসব নিয়ে বানিয়ে কিছু বলব না। তবে যে মানুষকে আমি বড় হয়ে দেখেছি, তাঁর আচরণ দেখেই বোঝা যেত, তাঁর ভিত তৈরি হয়েছিল খুব যত্ন নিয়ে।একটা কথা প্রায়ই মনে হয়। বংশের নাম দিয়ে মানুষ বড় হয় না। ভালো পরিবারে জন্মানো একটা সুযোগ, একটা আমানত। সেই আমানত কেউ রক্ষা করে, কেউ নষ্ট করে। কেউ শুধু বাপ-দাদার নাম বলে বেড়ায়, আবার কেউ নিজের কাজ দিয়ে সেই নামকে আরও উজ্জ্বল করে।মামা ছিলেন দ্বিতীয় দলের মানুষ। তিনি নানার পরিচয়ে বসে থাকেননি। নিজে পড়েছেন, নিজে খেটেছেন, নিজের চরিত্র দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। পারিবারিক ঐতিহ্যকে তিনি জাদুঘরের জিনিস বানিয়ে রাখেননি, বরং সেটাকে জীবন্ত রেখেছেন, মানুষের কাজে লাগিয়েছেন।আমি যখন তাঁর জীবনের দিকে তাকাই, তখন তিনটা বৃত্ত দেখতে পাই। প্রথমটা পরিবার, যেখানে তাঁর ভিত তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়টা মাদরাসা, যেখানে সেই শিক্ষা দায়িত্বে রূপ নিয়েছে। তৃতীয়টা সমাজ, যেখানে সেই দায়িত্ব মানুষের জীবনে গিয়ে পৌঁছেছে। এই তিনটা বৃত্ত আলাদা নয়, একটা আরেকটার ভেতরে ঢুকে গেছে। মামার জীবনকে বুঝতে হলে এই তিনটাকে একসঙ্গেই দেখতে হয়।নানার ঘর থেকে মামা যা পেয়েছিলেন, তা তিনি শুধু নিজের কাছে রেখে দেননি। পরিবারের ছোটদের মধ্যেও সেই মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমি নিজে সেই উত্তরাধিকারের একজন ভাগীদার। আজ যখন নিজের ভেতরে জ্ঞানের প্রতি টান, বড়দের প্রতি সম্মান আর দায়িত্বের বোধ খুঁজে পাই, তখন বুঝি, এর শিকড় অনেক গভীরে, নানার ঘর থেকে মামার হাত ঘুরে আমার কাছে পৌঁছেছে।১৯৪৪: বাবার শূন্যতা, শিক্ষকের আসনেমামার জীবনের একটা বড় বাঁক আসে ১৯৪৪ সালে। প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, কামিল পাস করার পর সেই বছর নানা ইন্তেকাল করেন। আর সেই প্রেক্ষাপটে মামা চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।এই ঘটনাটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। একজন তরুণ সবে পড়াশোনা শেষ করেছেন। সামনে হয়তো আরও অনেক স্বপ্ন ছিল, আরও পড়ার ইচ্ছা ছিল, অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল। ঠিক সেই সময় বাবাকে হারানো। শোকের ভার তো ছিলই, তার সঙ্গে এল একটা পরিবারের দায়িত্ব, আর একটা প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বোধ।আমি জানি না সেই দিনগুলোতে মামার মনের অবস্থা ঠিক কেমন ছিল। তিনি কখনো সেসব নিয়ে আমাকে বিস্তারিত কিছু বলেছেন বলে নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারি না। কিন্তু একটু চোখ বন্ধ করলেই কল্পনা করতে পারি, কতটা কঠিন ছিল সেই সময়। অনেকে এমন মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। মামা ভেঙে পড়েননি। তিনি বাবার রেখে যাওয়া জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।শিক্ষকতা বাইরে থেকে দেখলে সহজ মনে হয়। ক্লাসে যাও, পড়াও, বাড়ি ফেরো। কিন্তু যিনি সত্যিই শিক্ষক, তিনি জানেন এর ভেতরে কত কাজ। আগের রাতে পাঠ তৈরি করা, ছাত্রের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত থাকা, কে কোথায় দুর্বল তা খেয়াল করা, কারও আগ্রহ কমে গেলে তাকে আবার টেনে তোলা। প্রতিদিন, বছরের পর বছর।মামা এই কাজটা করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। ১৯৪৪ থেকে শুরু করে কয়েক দশক। ভাবলে অবাক লাগে, কত ছাত্র তাঁর সামনে বসেছে, কত জনের হাতে তিনি কিতাব খুলে দিয়েছেন, কত জনের প্রথম ভুল তিনি ধৈর্য ধরে শুধরে দিয়েছেন।আমার মনে হয়, একজন ভালো উস্তাযের প্রভাব কিতাবের পাতার বাইরেও অনেক দূর যায়। ছাত্র হয়তো দশ বছর পর কিতাবের অনেক কথা ভুলে যায়। কিন্তু উস্তায কিভাবে কথা বলতেন, কিভাবে রাগ সামলাতেন, কিভাবে ভুল স্বীকার করতেন, সেটা মনে থেকে যায়। মামার ছাত্রদের অনেকের কাছেই, আমার বিশ্বাস, তিনি এভাবেই বেঁচে আছেন।১৯৪৪ সালের সেই সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটা চাকরিতে যোগ দেওয়া ছিল না। সেটা ছিল একটা জীবন বেছে নেওয়া, যে জীবনটা তিনি শেষ পর্যন্ত মানুষকে শেখানোর কাজেই কাটিয়ে দিয়েছেন।অধ্যক্ষের চেয়ারে এক দশক১৯৭১ সাল। দেশের জন্য এক অস্থির, রক্তাক্ত, অনিশ্চিত বছর। ঠিক সেই বছরেই মামা চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন, প্রকাশিত বিবরণে এমনটাই আছে। এরপর প্রায় এক দশক তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।সেই সময়ে একটা প্রতিষ্ঠান চালানো কেমন ছিল, আজকের দিনে বসে পুরোটা বোঝা কঠিন। চারপাশে ভয়, অভাব, ভাঙাচোরা অবস্থা। যুদ্ধের পর নতুন দেশ, নতুন বাস্তবতা। মানুষ নিজের সংসার টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে একটা মাদরাসার শিক্ষক, ছাত্র, পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, সব ধরে রাখা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না।এমন সময়ে মাদরাসার দরজা খোলা রাখাটাই একটা বড় সাহসের কাজ। ছাত্ররা যেন পড়া ছেড়ে না দেয়, শিক্ষকরা যেন হতাশ হয়ে চলে না যান, প্রতিষ্ঠানের ভিত যেন নড়ে না যায়, এসব নিশ্চিত করতে একজন দৃঢ় মানুষের দরকার ছিল। মামা সেই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন।শিক্ষক হিসেবে একজনের দায়িত্ব নিজের ক্লাস পর্যন্ত। কিন্তু অধ্যক্ষ হলে পুরো প্রতিষ্ঠান কাঁধে আসে। শিক্ষকদের মধ্যে মিল রাখতে হয়। ছাত্রদের শৃঙ্খলা দেখতে হয়। কোথায় কি ঘাটতি, কার কি সমস্যা, সেসবের দিকে নজর রাখতে হয়। অভিভাবকদের প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। আর দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আরেকটা ভার, ছাত্রদের চরিত্র গড়ে তোলার দায়িত্ব।আমি অনেক প্রতিষ্ঠান দেখেছি যেখানে প্রধান ব্যক্তি শুধু হুকুম দেন। আবার কিছু জায়গায় দেখেছি, প্রধান ব্যক্তি নিজে সবার আগে আসেন, সবার শেষে যান, আর তাঁর আচরণ দেখেই বাকিরা শেখে। মামার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি, তা থেকে বলতে পারি, তিনি নেতৃত্বকে দেখতেন দায়িত্ব হিসেবে, ক্ষমতা হিসেবে নয়।নেতৃত্বের এই ধারণা আমার মনে গেঁথে আছে। পদ মানুষের সম্মানের জন্য নয়, মানুষের কাজে লাগার জন্য। এই ভাবনার বীজ কোথায় পোঁতা হয়েছিল, আমি জানি।প্রায় দশ বছর একটা প্রতিষ্ঠানের হাল ধরে রাখা অনেক বড় ব্যাপার। এর মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে, অনেক রাত চিন্তায় কেটেছে। সেসবের বিস্তারিত হিসাব কোথাও লেখা নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটা টিকে আছে, ছাত্ররা আজও সেখানে পড়ছে, আর এই টিকে থাকার পেছনে যাঁদের ঘাম আছে, মামা তাঁদের একজন।অধ্যক্ষের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও মামা মাদরাসা থেকে দূরে সরে যাননি। পরিচালনা পরিষদে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা সেটাই বলে। পদ ছাড়লেই অনেকে প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নেওয়া বন্ধ করে দেয়। মামার কাছে মাদরাসা কোনো চাকরির জায়গা ছিল না, ছিল জীবনের অংশ। চেয়ার বদলেছে, কিন্তু টান বদলায়নি।আমার উস্তায: জ্ঞান আর বিনয়মামাকে আমি যখন উস্তায বলি, তখন সেটা শুধু সম্মানের ডাক নয়। তাঁর কাছ থেকে আমি সত্যিই শিখেছি। কিতাবের কথা যেমন শিখেছি, তেমনি শিখেছি জ্ঞানকে কিভাবে বহন করতে হয়।একটা ঘটনা আমার জীবনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। একদিন মামা আমার বইয়ের একটা মলাটের ওপর চোখ রাখলেন। সেখানে আমি উর্দুতে কিছু লিখেছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এখানে কি লিখেছ? আমি বললাম। তিনি বললেন, তুমি এটা ভুল লিখেছ।কিন্তু ভুল ধরিয়ে দিয়েই তিনি থেমে যাননি। নিজে থেকেই প্রস্তাব দিলেন, অন্তত এক মাস তিনি আমাকে উর্দু শেখাবেন। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া। প্রতিদিন মাগরিব থেকে ইশা পর্যন্ত, তাঁর নিজের মসজিদে।সেই এক মাস আমার জীবনের অন্যতম দামি সময়। এত অল্প সময়ে তিনি এমনভাবে শিখিয়েছেন যে উর্দুর ওপর আমার ভালো দখল তৈরি হয়ে গেল। আজ আমি উর্দুতে সাবলীলভাবে বলতে আর লিখতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ, উর্দুতে কিছু না'তও লিখেছি। যতবার একটা না'ত লিখি, ততবার মনে পড়ে মাগরিব আর ইশার মাঝের সেই সময়টুকু, আর সেই মানুষটিকে, যিনি একটা ভুল দেখে শুধু ভুল বলে থেমে যাননি, বরং নিজের সময় দিয়ে আমাকে শুধরে দিয়েছিলেন।ভালো উস্তায কেমন হন, এই ঘটনা থেকে আমি বুঝি। তিনি ভুল ধরিয়ে দেন, কিন্তু সেখানে থামেন না। শুধরে নেওয়ার পথটাও হাতে ধরে দেখিয়ে দেন।আমাদের দ্বীনে জ্ঞানের মর্যাদা অনেক উঁচুতে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তিনি ঈমানদার ও জ্ঞানপ্রাপ্তদের মর্যাদা উঁচু করে দেন (সূরা আল-মুজাদালাহ, ৫৮:১১)। আবার সূরা ফাতিরে আছে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে (৩৫:২৮)। এই দুটো আয়াত পাশাপাশি রাখলে একটা কথা পরিষ্কার হয়। সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে না, বরং আল্লাহর সামনে আরও নত করে দেয়।মামার মধ্যে আমি এই নত হওয়াটা দেখেছি। তিনি জানতেন অনেক, কিন্তু জানার ভাব দেখাতেন না। কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না হলে সেটা স্বীকার করতে তাঁর কোনো সংকোচ ছিল না। আমার কাছে আলিমের এই গুণটাই সবচেয়ে বড় মনে হয়। যে মানুষ বলতে পারে, এটা আমি নিশ্চিত জানি না, তার কথার ওপর ভরসা করা যায়।হাদিছে আছে, আলিমরা নবীদের উত্তরাধিকারী। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত এই হাদিস আবু দাউদ ও তিরমিযিতে আছে। নবীরা টাকাপয়সা রেখে যাননি, রেখে গেছেন জ্ঞান। ছোটবেলায় এই হাদিস শুনে মনে হতো, আলিম হওয়া মানে বিরাট সম্মান। বড় হয়ে বুঝেছি, এটা আসলে বিরাট দায়িত্ব। উত্তরাধিকার পেলে তা রক্ষা করতে হয়, পরের প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দিতে হয়।মামা এই দায়িত্বটা বুঝতেন। তিনি জানতেন, একজন আলিমের একটা কথা মানুষের নামায, সংসার, লেনদেন, সবকিছুকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই তিনি কথা বলতেন মেপে। মতভেদের জায়গায় শালীন থাকতেন। নিজের মর্যাদার চেয়ে সত্যকে বড় করে দেখতেন।আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, যে যত জোরে কথা বলে, তাকে তত বড় জ্ঞানী মনে করা হয়। মামা ছিলেন এর উল্টো। তাঁর কণ্ঠে উচ্চতা ছিল না, ছিল গভীরতা। তিনি তর্কে জেতার চেয়ে মানুষকে বোঝানোকে বেশি জরুরি মনে করতেন। আর কাউকে ছোট করে নিজেকে বড় দেখানোর অভ্যাস তাঁর মধ্যে কখনো দেখিনি।একজন কৃতি আলিম বলতে আমি এমন মানুষকেই বুঝি। যার জ্ঞান আছে, আর সেই জ্ঞানের ওজন বহন করার মতো চরিত্রও আছে। মামাকে দেখে আমি শিখেছি, পড়াশোনা শেষ হয় না, আর যত বেশি জানা যায়, তত বেশি বোঝা যায় কত কিছু এখনো জানা বাকি। এই বোধটা আমি আজও লালন করি, আর নতুন কিছু শিখতে বসলে প্রায়ই তাঁর কথা মনে পড়ে।কুরআনের সঙ্গে আজীবন সম্পর্কমামাকে নিয়ে যে প্রাথমিক জীবনী-বিবরণ তৈরি হয়েছিল, তাতে একটা কথা আছে যা আমাকে খুব নাড়া দেয়। বলা হয়েছে, তিনি বৃদ্ধ বয়সে পুরো কুরআন হিফজ করেছিলেন।কথাটা লিখতে গিয়ে আমি একটু থেমেছি। কারণ এই ঘটনার নির্দিষ্ট বয়স, কত সময় লেগেছিল, কার কাছে শুনিয়েছিলেন, কে সাক্ষী ছিলেন, এসব তথ্য আমার হাতে নেই। তাই আমি এটাকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে দাবি করছি না। ভবিষ্যতে কেউ যদি তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখেন, তাহলে এই বিষয়টা যাচাই করে যোগ করা উচিত। যাঁরা সেই সময়ের সাক্ষী, তাঁদের কাছ থেকে কথা সংগ্রহ করা দরকার।তবু এই প্রসঙ্গটা আমি বাদ দিতে চাইনি। কারণ এর ভেতরে যে শিক্ষা আছে, তা যেকোনো মানুষের কাজে লাগে।বয়স বাড়লে মানুষ সাধারণত ভাবে, শেখার সময় শেষ। স্মৃতি আগের মতো কাজ করে না, শরীর ক্লান্ত থাকে, মন সহজে বসে না। অনেকেই তখন বলে, এখন আর নতুন কিছু শিখে কি হবে। কিন্তু কেউ যদি সেই বয়সে কুরআনের মতো বিশাল কিতাব মুখস্থ করার সাহস করেন, তাহলে বোঝা যায়, শেখার আগ্রহ তাঁর কাছে সারাজীবনের ব্যাপার।হিফজ শুধু ভালো স্মৃতিশক্তির খেলা নয়। এর জন্য লাগে প্রতিদিনের নিয়ম, বারবার পড়া, সময়ের হিসাব করে চলা, আর সবচেয়ে বেশি লাগে ধৈর্য। একটা পৃষ্ঠা আজ মুখস্থ হলো, কাল আবার ভুলে গেল, পরশু আবার বসতে হলো। এই ধৈর্যের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে।তবে আমার কাছে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু মুখস্থ করা বা তিলাওয়াত করার মধ্যে আটকে নেই। কুরআন পড়া, তার অর্থ বোঝা, আর সেই অনুযায়ী জীবন চালানো, এই তিনটা মিলেই সম্পূর্ণ সম্পর্ক। কুরআন যে অন্তরে ধারণ করে, তার ওপর এর নির্দেশ মেনে চলার দায়িত্বও বেশি এসে পড়ে।মামার জীবনের দিকে তাকালে আমি এই বড় ছবিটাই দেখি। একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন কুরআনের পাশে থেকেছেন। পড়েছেন, পড়িয়েছেন, খুতবায় তার কথা মানুষকে শুনিয়েছেন, আর নিজের আচরণে তার শিক্ষা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। হিফজের ঘটনাটা যাচাই হোক বা না হোক, এই সম্পর্কটা ছিল সত্য, আর আমি নিজে তার সাক্ষী।আমার নিজের কাছেও এখান থেকে একটা প্রশ্ন আসে। আমি কুরআনের সঙ্গে কতটা সময় কাটাই? শুধু রমজানে খতম দেওয়া, নাকি প্রতিদিন একটু হলেও পড়া, অর্থ বোঝার চেষ্টা করা? মামার জীবনের দিকে তাকালে এই প্রশ্নটা আমাকে বারবার নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। আর আমার বিশ্বাস, একজন ভালো মানুষের স্মৃতি এভাবেই কাজ করে, আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।পীর মামা: শরী‘আহ আর অন্তরের পরিশুদ্ধিচুনতির মানুষের মুখে মামার সবচেয়ে পরিচিত পরিচয় হলো পীর সাহেব। প্রকাশিত জীবনীতে তাঁকে মুজাদ্দেদিয়া তরিকার পীর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এটাও আছে যে তিনি তাঁর মুরিদ ও অনুসারীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক আর সামাজিক জীবনে ইসলামের আদর্শ মেনে চলার উপদেশ দিতেন।পীর শব্দটা শুনলে আজকাল অনেকের মনে নানা রকম ছবি ভেসে ওঠে। কেউ ভাবে অলৌকিক কিছু, কেউ ভাবে মাজার আর মানত, কেউ আবার পুরো ব্যাপারটাকেই সন্দেহের চোখে দেখে। মামাকে কাছ থেকে দেখে আমার ধারণা অন্যরকম তৈরি হয়েছে।আমার বোঝায়, শরী‘আহ আর আত্মশুদ্ধি একই জীবনের দুটো দিক। শরী‘আহ শেখায় কিভাবে নামায পড়তে হবে, কিভাবে রোযা রাখতে হবে, কিভাবে লেনদেন করতে হবে, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে। আর আত্মশুদ্ধির সাধনা মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়। নিয়তটা ঠিক আছে কি না, মনে অহংকার জমছে কি না, কারও প্রতি হিংসা আছে কি না, লোভ বা লোক দেখানোর ইচ্ছা কাজ করছে কি না।এই দুটোর একটা বাদ দিলে গোলমাল হয়। আমি এমন মানুষ দেখেছি, যে বাইরের সব নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু কথায় কথায় অন্যকে কষ্ট দেয়। আবার এমন মানুষও দেখেছি, যে বলে আমার মন পরিষ্কার, কিন্তু ফরয কাজগুলোতেই গাফিলতি করে। দুটোই অসম্পূর্ণ।কুরআনে আল্লাহর ওলিদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে খুব সহজ ভাষায়। তাঁরা ঈমান আনে আর তাকওয়া অবলম্বন করে (সূরা ইউনুস, ১০:৬২–৬৩)। এই মাপকাঠিটা আমার খুব ভালো লাগে। এখানে কোনো রহস্য নেই, কোনো অলৌকিকতার দাবি নেই। আছে বিশ্বাস, আছে দায়িত্ববোধ, আছে চরিত্র। আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথ মানুষের প্রতিদিনের নৈতিক জীবন থেকে আলাদা কিছু নয়।মামার তরিকতের তালিম আমি এভাবেই দেখি। তিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন, কিন্তু সেই ডাক মানুষকে সংসার থেকে, দায়িত্ব থেকে, সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিত না। বরং মানুষকে আরও ভালো সন্তান, ভালো স্বামী বা স্ত্রী, ভালো প্রতিবেশী, ভালো মানুষ হতে শেখাত।মুজাদ্দেদিয়া তরিকার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো শরী‘আহর প্রতি কঠোর আনুগত্য। এই ধারায় সুন্নাহর বাইরে গিয়ে কোনো আধ্যাত্মিকতার জায়গা নেই। মামার তালিমে আমি এই কথাটাই প্রতিফলিত হতে দেখেছি। তাঁর কাছে আত্মশুদ্ধির পথ শুরু হতো সঠিকভাবে নামায পড়া, হালাল রুজি আর মানুষের হক আদায় থেকে। রহস্যময় কোনো গোপন পথ নয়, বরং প্রতিদিনের সাদামাটা কিন্তু কঠিন সাধনা।একটা বিষয় এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার। মামার আধ্যাত্মিক সিলসিলা, কার কাছে বায়আত হয়েছিলেন, কার কাছ থেকে খিলাফত পেয়েছিলেন, এসবের নির্ভরযোগ্য দলিল আমার হাতে নেই। প্রাথমিক খসড়ায় কিছু দাবি ছিল, কিন্তু সূত্র না পাওয়ায় সেগুলো আমি এখানে রাখিনি। কাউকে শ্রদ্ধা করি বলে তাঁর নামে অপ্রমাণিত কথা বলব, এটা আমি চাই না।ঘরে-বাইরে একই মানুষমুর্শিদের আসল কাজ কি? আমার কাছে এর উত্তর হলো, মানুষকে নিজের ভুল চিনতে সাহায্য করা, নিয়ত শুধরে নিতে শেখানো, আর ধীরে ধীরে ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে পাশে থাকা। তারবিয়াত শব্দটার ভেতরেও এই ধীরে ধীরে গড়ে তোলার ভাবটা আছে। যেমন মালি একটা চারাগাছকে দিনের পর দিন পানি দেয়, আগাছা তোলে, রোদ-বৃষ্টি থেকে আগলে রাখে।একটা কথা আমি খুব বিশ্বাস করি। কেউ যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, কিন্তু বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, স্ত্রীর হক নষ্ট করে, সন্তানের খোঁজ রাখে না, অফিসে অন্যায় করে, লেনদেনে ঠকায়, তাহলে তার আত্মশুদ্ধির দাবি টেকে না। ইবাদত আর আচরণ যদি দুই পথে চলে, তাহলে কোথাও একটা বড় ফাঁক থেকে যায়।মামার শিক্ষায় এই ফাঁকটা ছিল না। তাঁর কাছে দ্বীন মানে ছিল পুরো জীবন। মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব, জীবনসঙ্গীর অধিকার, সন্তানের যত্ন, প্রতিবেশী যেন নিরাপদ থাকে, অন্যের এক টাকাও যেন অন্যায়ভাবে নিজের কাছে না আসে, এসব তাঁর কাছে ছিল দ্বীনেরই অংশ।আমি যখন ভাবি, একজন মানুষ কতটা খাঁটি, তখন একটা প্রশ্ন নিজেকে করি। লোকটা কি ঘরে আর বাইরে একই রকম? মসজিদের মিম্বারে যে কথা বলে, নিজের বাড়ির উঠোনে কি সে কথা মেনে চলে? মামার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমার মনে কোনো দ্বিধা নেই। আত্মীয় হিসেবে আমি তাঁকে ঘরের ভেতরেও দেখেছি, আর ছাত্র হিসেবে দেখেছি বাইরে। দুই জায়গায় আমি একই মানুষকে পেয়েছি।একজন উস্তায, রাহবার আর অভিভাবকের কাজ এখানে এসে এক হয়ে যায়। তিনি সব সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে দেন না। বরং মানুষকে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে শেখান। নিজের কাজকে কোন মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে, সেটা দেখিয়ে দেন। আর ভুল হলে সেটা মেনে নিয়ে শুধরে নেওয়ার সাহস দেন।আমার জীবনে মামা এই কাজটাই করেছেন। তিনি আমাকে কোনো ছাঁচে ফেলে গড়তে চাননি। বরং এমন কিছু মূল্যবোধ দিয়েছেন, যেগুলো দিয়ে আমি নিজের পথ নিজে চিনে নিতে পারি। এখনো কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ালে মনে মনে ভাবি, মামা হলে এখানে কি করতেন। আর প্রায়ই সেই প্রশ্নটাই আমাকে সঠিক দিকে ঠেলে দেয়।আমার মনে হয়, ভালো অভিভাবক সেই মানুষ, যাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর শিক্ষা কাজ করে। তিনি সামনে না থাকলেও মনে হয়, তিনি দেখছেন। এটা ভয় থেকে নয়, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা থেকে আসে। মামা চলে যাওয়ার এত বছর পরেও আমি এই অনুভূতিটা টের পাই।মিম্বারে, মাদরাসায়, সমাজেমামার কাজ শুধু একটা মাদরাসার ক্লাসরুমে আটকে ছিল না। প্রকাশিত বিবরণে দেখা যায়, চুনতি হাকিমিয়া মাদরাসার পরিচালনা পরিষদে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। চুনতি মহিলা মাদরাসা আর আধুনগর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। আর চুনতি জামে মসজিদে তিনি বহু বছর খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যেমন কঠিন, টিকিয়ে রাখা তার চেয়েও কঠিন। শুরুতে উৎসাহ থাকে, মানুষ ভিড় করে। কিন্তু বছরের পর বছর সেটা চালিয়ে নিতে লাগে এমন কিছু মানুষ, যারা নিয়মিত খোঁজ রাখে, ঝামেলা মেটায়, ঘাটতি পূরণ করে, আর কৃতিত্ব না চেয়েও কাজ করে যায়। মামা ছিলেন সেই ধরনের মানুষ। এই কাজের ফল একদিনে দেখা যায় না, ছড়িয়ে পড়ে বহু প্রজন্মে।মহিলা মাদরাসার সঙ্গে তাঁর যুক্ত থাকাটাও আমার কাছে অর্থবহ মনে হয়। মেয়েদের দ্বীনি শিক্ষা যে একটা পরিবার, একটা সমাজকে কতটা বদলে দিতে পারে, সেটা যাঁরা বোঝেন, তাঁরা এই কাজে সময় দেন।আধুনগর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও দেখায়, তাঁর চিন্তা শুধু নিজের গ্রামের সীমানায় আটকে ছিল না। আশপাশের এলাকার দ্বীনি শিক্ষাও তাঁর কাছে সমান গুরুত্বের ছিল। একজন আলিমের দায়িত্ব যে এক জায়গায় বাঁধা থাকে না, এটা তিনি নিজের কাজ দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন।জুমার খুতবা নিয়ে আলাদা করে বলতে চাই। খতিবের সামনে বসে থাকে নানা ধরনের মানুষ। কৃষক, দোকানদার, ছাত্র, চাকরিজীবী, বৃদ্ধ, কিশোর। সপ্তাহে একবার তারা এক জায়গায় বসে মন দিয়ে শোনে। এই সুযোগে খতিব চাইলে মানুষকে নামায-রোযার কথা যেমন বলতে পারেন, তেমনি বলতে পারেন সংসারে কার কি হক, ব্যবসায় সততা কেন জরুরি, প্রতিবেশীর সঙ্গে কেমন থাকতে হয়, সমাজে শান্তি কিভাবে রক্ষা করতে হয়।সুন্নাহ মেনে চলা মানে শুধু কিছু বাহ্যিক আমল নয়। নবীজির ﷺ সুন্নাহর মধ্যে আছে সত্য বলা, দয়া করা, ন্যায়বিচার করা, মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করা। একজন ধর্মীয় নেতা মুখের কথার চেয়ে আচরণ দিয়েই বেশি শেখান। তিনি অন্যের কথা কতটা মন দিয়ে শোনেন, দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন, যে তাঁর সঙ্গে একমত নয় তার প্রতি কতটা সংযত থাকেন, মানুষ এসব খেয়াল করে।ধর্মীয় ভুল শোধরানোর ক্ষেত্রেও জ্ঞান আর প্রজ্ঞা দুটোই লাগে। কোথাও যদি স্পষ্ট নিষেধ থাকে, সেটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলতে হয়। আবার যেখানে ফিকহের স্বীকৃত মতভেদ আছে, সেখানে অন্য মতকে সম্মান করতে হয়। এভাবে শেখালে মানুষ দ্বীন সম্পর্কে সচেতনও হয়, আবার একে অপরকে ছোটও করে না। আমার চোখে ধর্মীয় নেতৃত্বের লক্ষ্য একটাই, মানুষকে আল্লাহর কাছে দায়িত্বশীল আর মানুষের কাছে ন্যায়পরায়ণ করে তোলা।সীরাতের দিনগুলোচুনতির কথা উঠলে সীরাতুন্নবী ﷺ মাহফিলের কথা আসবেই। এটা এখন শুধু একটা অনুষ্ঠান নয়, চুনতির পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এই মাহফিল শুরু করেছিলেন হযরত শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.), ১৯৭২ সালে। পরে সময়ের সঙ্গে মাহফিলের দিন বাড়তে বাড়তে উনিশ দিনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।ভাবলে অবাক লাগে, যে বছর মামা অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিলেন, তার পরের বছরই চুনতিতে এই মাহফিলের যাত্রা শুরু। দেশ তখন সবে স্বাধীন হয়েছে। চারদিকে ভাঙন, অভাব আর নতুন করে গড়ার চেষ্টা। সেই সময়ে নবীজির জীবন নিয়ে আলোচনার এমন একটা আয়োজন মানুষের মনে নিশ্চয়ই অনেক আশা আর সান্ত্বনা জাগিয়েছিল।মামার জীবনকে আমি এই বড় পরিবেশের ভেতরে রেখে দেখতে চাই। তবে এখানে একটু সাবধান থাকা দরকার। মাহফিলের প্রতিষ্ঠাতা, আয়োজক, আর অন্য যেসব আলিম এতে অবদান রেখেছেন, প্রত্যেকের কাজ আলাদা করে, দলিলের ভিত্তিতে বলা উচিত। মাহফিল পরিচালনায় মামার নির্দিষ্ট ভূমিকা কি ছিল, তার পূর্ণ বিবরণ আমার হাতে থাকা সূত্রে পাইনি। তাই আমি এখানে কোনো বাড়তি দাবি করছি না। শুধু এটুকু বলি, যে পরিবেশে এই মাহফিল জন্ম নিয়েছে আর বেড়ে উঠেছে, মামা সেই পরিবেশেরই একজন মানুষ ছিলেন।সীরাতচর্চার আসল মূল্য কোথায়? আমার মনে হয়, নবীজির ﷺ জীবন থেকে শেখার মধ্যে। তিনি কিভাবে আমানত রক্ষা করতেন, কিভাবে ন্যায়বিচার করতেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতেন, প্রতিবেশীর হক নিয়ে কি বলেছেন, মানুষের প্রতি তাঁর মমতা কতটা গভীর ছিল। এসব নিয়ে আলোচনা হলে একটা সমাজের নৈতিক জীবন সমৃদ্ধ হয়।আমার একটা স্বপ্ন আছে। চুনতির এই ঐতিহ্য যেন নতুন প্রজন্মের কাছে শুধু একটা উৎসব হয়ে না থাকে। বরং জ্ঞান আর চরিত্র গড়ার একটা সুযোগ হয়ে ওঠে। এর জন্য দরকার নির্ভরযোগ্য তথ্য, যোগ্য বক্তা, সহজ ভাষা, আর এমন আলোচনা যা মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে মেলে। মামা বেঁচে থাকলে, আমার বিশ্বাস, তিনিও এমনটাই চাইতেন।সীরাত মাহফিলের কথা ভাবলে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে। উনিশ দিন ধরে হাজারো মানুষ নবীজির ﷺ জীবনের কথা শোনে। কিন্তু মাহফিল শেষে তারা কি নিয়ে ঘরে ফেরে? যদি একজন মানুষও ফিরে গিয়ে মায়ের সঙ্গে একটু নরম স্বরে কথা বলে, দোকানে ওজনে একটু কম না দেয়, প্রতিবেশীর খোঁজ নেয়, তাহলেই মাহফিলের আসল উদ্দেশ্য পূরণ হয়। মামার জীবন আমাকে এই মাপকাঠিতেই সবকিছু দেখতে শিখিয়েছে।মামা, উস্তায, রাহবার, অভিভাবকএই লেখার সবচেয়ে ব্যক্তিগত জায়গায় এসে পৌঁছেছি। এতক্ষণ যা বললাম, তা হয়তো অন্য কেউও লিখতে পারতেন। কিন্তু এখন যা বলব, তা শুধু আমিই বলতে পারি।মামাকে আমি চার নামে চিনি। চারটা নামই সত্য, আর চারটাই আমার কাছে আলাদা আলাদা অর্থ বহন করে।মামা ডাকে আছে আত্মীয়তার উষ্ণতা। মায়ের ভাই হিসেবে তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের একজন আপনজন। তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য কোনো অনুমতি লাগত না, কোনো আনুষ্ঠানিকতা লাগত না।উস্তায ডাকে আছে শিক্ষার ঋণ। তিনি আমাকে যা শিখিয়েছেন, তার হিসাব কোনো খাতায় লেখা যায় না। কিছু শিখেছি তাঁর মুখের কথায়, অনেক বেশি শিখেছি তাঁকে দেখে দেখে।রাহবার শব্দটা হয়তো আমাদের পুরোনো দিনের ভাষায় খুব পরিচিত নয়, কিন্তু এর চেয়ে ভালো শব্দ আমি খুঁজে পাইনি। রাহবার মানে এমন একজন, যিনি জীবনের পথে পাশে হাঁটেন। কোন মোড়ে কোন দিকে যাব, কোন সুযোগ নেব, কোনটা ছেড়ে দেব, এসব প্রশ্নে তিনি আলো দেখান, কিন্তু হাত ধরে টেনে নিয়ে যান না। মামা আমার জীবনে ঠিক এই কাজটা করেছেন।আর অভিভাবক ডাকে আছে আস্থা আর আশ্রয়। মাথার ওপর একটা ছায়া থাকলে মানুষ অনেক ঝড় সাহস নিয়ে পার হতে পারে। মামা ছিলেন সেই ছায়া।এই চারটা পরিচয় আসলে একটা আরেকটার সঙ্গে জড়ানো। শিক্ষা মানুষের মনকে বড় করে। নির্দেশনা সেই শিক্ষাকে জীবনে কাজে লাগাতে শেখায়। আর অভিভাবকত্ব এমন একটা নিরাপদ জায়গা তৈরি করে, যেখানে মানুষ ভুল করতে পারে, শিখতে পারে, আর দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারে।আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। এমন একজন মানুষ আমার আত্মীয় ছিলেন, আর আমার পড়াশোনা ও জীবনদৃষ্টির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন। সবার ভাগ্যে এমনটা জোটে না।কৃতজ্ঞতা জিনিসটা অদ্ভুত। যাঁর কাছে ঋণী, তিনি বেঁচে থাকতে অনেক সময় ঠিকমতো বলা হয়ে ওঠে না। ভাবি, পরে বলব, আরেকদিন বলব। তারপর একদিন সেই সুযোগটাই আর থাকে না। মামাকে আমি কতটা শ্রদ্ধা করতাম, কতটা ভালোবাসতাম, সেটা পুরোপুরি মুখে বলতে পেরেছিলাম কি না, জানি না। এই লেখা হয়তো সেই না-বলা কথাগুলোরই একটা দেরিতে পৌঁছানো চিঠি।তবে এই ভাগ্যের একটা দাবিও আছে। তাঁকে যতটা সম্ভব সঠিকভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা। তাঁর নামে এমন কোনো কথা প্রচার না করা, যা তিনি বলেননি। গল্প বানিয়ে তাঁকে বড় করার দরকার নেই, তাঁর সত্যিকারের জীবনই যথেষ্ট বড়। তাঁর কাজ আর শিক্ষার নির্ভরযোগ্য বিবরণ রেখে যাওয়াই আমার কাছে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর সবচেয়ে দায়িত্বশীল উপায়।আজকের দিনে মামাকে মনে পড়েমামা যে সময়ে বেঁচে ছিলেন, আর আজ আমরা যে সময়ে বাস করছি, দুটোর মধ্যে অনেক তফাত। তখন মানুষ খবর পেত মুখে মুখে, চিঠিতে, বড়জোর রেডিওতে। আজ হাতের মুঠোয় পুরো দুনিয়া। কথা বলার মানুষ বেড়েছে বহুগুণ, কিন্তু মন দিয়ে শোনার মানুষ যেন কমে গেছে।এই সময়ে দাঁড়িয়ে মামার কথা আমার আরও বেশি মনে পড়ে। আজ যে কেউ একটা ভিডিও বানিয়ে নিজেকে আলিম বলে পরিচয় দিতে পারে। কোনো যাচাই নেই, কোনো উস্তায নেই, কোনো জবাবদিহি নেই। একটা কথা মুহূর্তে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেটা সত্য হোক বা মিথ্যা। এমন দিনে মামার সেই মেপে কথা বলার অভ্যাস, নিশ্চিত না হলে চুপ থাকার সাহস, আমার কাছে আরও দামি মনে হয়।আজকের দিনে ধর্ম নিয়ে তর্কও অনেক বেড়েছে। ছোটখাটো মতভেদ নিয়ে মানুষ একে অপরকে গালি দেয়, দল ভাগ করে, সম্পর্ক ছিন্ন করে। অথচ মামার কাছে দেখেছি, যেখানে ফিকহের স্বীকৃত মতভেদ আছে, সেখানে সংযম রাখাটাও দ্বীনের অংশ। ভিন্নমতের মানুষকে সম্মান করা দুর্বলতা নয়, বরং জ্ঞানের পরিপক্বতা।আরেকটা জিনিস আমাকে ভাবায়। এখন অনেকেই ধর্মকে একটা ব্যক্তিগত অভ্যাসে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। নামায পড়ি, রোযা রাখি, ব্যস, বাকি জীবন আমার নিজের মতো। আবার কেউ কেউ শুধু সমাজসেবার কথা বলে, ইবাদতকে গুরুত্বই দেয় না। মামার জীবন এই দুই প্রান্তের মাঝখানে একটা সুন্দর ভারসাম্যের ছবি। তিনি আল্লাহর ইবাদতে যেমন নিষ্ঠাবান ছিলেন, তেমনি মাদরাসা, মসজিদ আর মানুষের প্রয়োজনে সারাজীবন খেটেছেন।নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। তোমরা যারা দ্বীন শিখতে চাও, তারা একজন ভালো উস্তায খুঁজে নাও। বই আর ইন্টারনেট থেকে তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু আদব, বিনয়, ধৈর্য আর চরিত্র শিখতে হয় মানুষের কাছ থেকে। মামার মতো মানুষেরা আমাদের এটাই শিখিয়ে গেছেন। জ্ঞান বইয়ে থাকে, কিন্তু জ্ঞান বহন করার আদব থাকে মানুষের জীবনে।আর যারা শিক্ষক, যারা মাদরাসা বা মসজিদের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের কাছে বলি, মামার জীবন একটা আয়নার মতো। এই আয়নায় নিজেকে দেখলে বোঝা যায়, দায়িত্বটা কত বড়, আর সেটা কত বিনয় আর ধৈর্য নিয়ে পালন করা দরকার। একজন শিক্ষকের একটা ভালো আচরণ একজন ছাত্রের সারাজীবন বদলে দিতে পারে, আবার একটা অবহেলা তাকে দ্বীন থেকে দূরেও ঠেলে দিতে পারে।সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু মানুষের ভেতরের প্রয়োজন বদলায় না। মানুষ এখনো একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ খোঁজে, যার কথায় ভরসা করা যায়, যার জীবন দেখে পথ চেনা যায়। মামা ছিলেন সেই রকম মানুষ। আর তাই আজকের এই অস্থির সময়েও তাঁর জীবন আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক।যা নিয়ে আমি পথ চলিমামা চলে গেছেন অনেক বছর হলো। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে পাওয়া কিছু শিক্ষা আমি প্রতিদিন সঙ্গে নিয়ে চলি। এগুলো কোনো তালিকা বানিয়ে মুখস্থ করা কথা নয়। এগুলো আমার ভেতরে বসে গেছে, আর জীবনের নানা মোড়ে আপনা থেকেই সামনে চলে আসে।প্রথম শিক্ষা, শেখার কোনো শেষ নেই। ডিগ্রি পেলেই পড়াশোনা শেষ হয়ে যায় না। জ্ঞান মানুষের বিচারবুদ্ধিকে শাণিত করে, আবার নিজের সীমাবদ্ধতাও চিনিয়ে দেয়। যে মানুষ বলে আমি সব জানি, সে আসলে শেখা বন্ধ করে দিয়েছে।দ্বিতীয় শিক্ষা, জ্ঞান আর আমল আলাদা থাকতে পারে না। কে কতটা কিতাব পড়েছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই পড়া তার আচরণে কতটা দেখা যায়। তার সততায়, দায়িত্ববোধে, মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে।তৃতীয় শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি মানে মানুষের হক আদায় করা। অন্তর পরিষ্কার হলে তার ছাপ পড়বে সংসারে, কর্মক্ষেত্রে, সমাজে। যে আত্মশুদ্ধির কথা বলে কিন্তু স্ত্রী-সন্তান বা প্রতিবেশীর হক মারে, তার সাধনায় কোথাও গলদ আছে।চতুর্থ শিক্ষা, ধৈর্য আর ধারাবাহিকতার মূল্য। মাদরাসা, মসজিদ, সমাজের প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর লেগে থাকা অনেক বড় অবদান। এই কাজে হাততালি কম, ফল দেরিতে আসে। কিন্তু যখন আসে, তখন বহু প্রজন্ম তার সুফল ভোগ করে।পঞ্চম শিক্ষা, প্রিয় মানুষের স্মৃতি রক্ষায় সততা লাগে। তাঁর জীবন নিয়ে দলিল, সাক্ষ্য আর স্মৃতিকথা সংগ্রহ করা দরকার। তাহলে নতুন প্রজন্ম নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে পারবে, তিনি কে ছিলেন আর কি করে গেছেন। চুনতির যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনাদের স্মৃতিগুলো লিখে রাখুন।এই অনুরোধের পেছনে একটা ভয়ও কাজ করে। যাঁরা মামাকে নিজের চোখে দেখেছেন, তাঁদের অনেকেই এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ চলেও গেছেন। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে অনেক স্মৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। একটা পুরোনো চিঠি, একটা ছবি, একটা খুতবার নোট, মাদরাসার পুরোনো খাতায় তাঁর হাতের লেখা, এসব ছোট জিনিসই একদিন বড় ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে। আমি চাই, এগুলো যেন অবহেলায় নষ্ট না হয়।সহিহ বুখারিতে একটা হাদিছ আছে (হাদিছ ৬৫০২), যেখানে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার পথ বোঝানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো ফরয পালন। তারপর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আরও কাছে আসতে থাকে। এই হাদিসটা আমার কাছে আত্মশুদ্ধির একটা মূল সূত্রের মতো। আগে নিজের কর্তব্য, তারপর বাড়তি সাধনা।মামার জীবনে আমি এই ক্রমটাই দেখেছি। দায়িত্বকে তিনি কখনো পেছনে ফেলেননি, আর দায়িত্ব পালনের ভেতর দিয়েই আল্লাহর দিকে এগিয়েছেন। এই শিক্ষাটাই আমি সবচেয়ে যত্ন করে আগলে রাখতে চাই।বিদায় ও দু'আপ্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৬ নভেম্বর মামা এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। একটা দীর্ঘ জীবনের পর্দা নামে, যে জীবনের বড় অংশ কেটেছে কিতাব, ক্লাসরুম, মিম্বার আর মানুষের মাঝে।মৃত্যুর খবর যখন আসে, তখন মানুষ প্রথমে হারানোর ব্যথাটাই টের পায়। পরে ধীরে ধীরে বোঝে, যিনি চলে গেলেন, তিনি আসলে কতটা রেখে গেলেন। মামার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। প্রথমে শূন্যতা। তারপর ধীরে ধীরে চোখে পড়েছে, তাঁর ছাত্ররা, তাঁর মুরিদরা, তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো, তাঁর খুতবা শোনা মানুষগুলো, সবার মধ্যে তিনি কোনো না কোনোভাবে রয়ে গেছেন।সেই দিনগুলোতে অনেক মানুষ তাঁর কথা বলেছেন। কেউ তাঁর ক্লাসের কথা মনে করেছেন, কেউ খুতবার কথা, কেউ কোনো কঠিন সময়ে পাওয়া তাঁর পরামর্শের কথা। প্রত্যেকের স্মৃতি আলাদা, কিন্তু সবার কথার মধ্যে একটা মিল ছিল। তিনি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। আর মানুষ তাঁর কাছ থেকে খালি হাতে ফিরত না, অন্তত একটা ভালো কথা, একটা দু'আ নিয়ে ফিরত।আমার কাছে তিনি একজন সম্মানিত আলিম, একজন মুর্শিদ, আর তার চেয়েও বেশি একজন আপনজন। আমার মামা, আমার উস্তায, আমার রাহবার, আমার অভিভাবক। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার সঙ্গে মিশে আছে শিক্ষার ঋণ আর ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা।এই লেখায় আমি চেষ্টা করেছি তাঁর জীবনের কয়েকটা দিক তুলে ধরতে। জ্ঞান আর আমলের মিল, শরী‘আহ আর আত্মশুদ্ধির ভারসাম্য, আর সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ। একজন আলিম কিভাবে শিক্ষকতা, প্রতিষ্ঠানের কাজ আর ধর্মীয় নির্দেশনার মধ্য দিয়ে সমাজে আলো ছড়াতে পারেন, তাঁর জীবন সেটার একটা জীবন্ত উদাহরণ।তাঁকে সম্মান জানানোর সবচেয়ে ভালো উপায় কি? আমার মনে হয় দুটো। এক, তাঁর জীবনের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা। দুই, তাঁর শিক্ষার ভালো দিকগুলো নিজের জীবনে গ্রহণ করা। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলা যায়, কিন্তু তাঁর শেখানো পথে চলাই আসল শ্রদ্ধা।শেষ করার আগে হাত তুলে দু'আ করি। হে আল্লাহ, আমার প্রিয় মামাকে তুমি মাফ করে দাও। তাঁর নেক আমল আর শিক্ষার খেদমত কবুল করো। জান্নাতে তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দাও। আর আমাদেরকেও উপকারী জ্ঞান, বিনয়, সৎ আমল আর মানুষের কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দাও। আমিন।
Make sure you enter the(*)required information