Forum



Author Topic: লৌকিক জ্ঞান (Read 259 Times)

Anwar

  • Chunati (Bagan Para)
  • 01833052324
  • anu.cnt@gmail.com
লৌকিক জ্ঞান
« on: 04 Oct 2015 »

সম্ভবত দুইহাজার দশ অথবা দুইহাজার নয় সাল। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে অধ্যয়ন করি। দিনটি ছিল শুক্রবার।শেরে বাংলা ছাত্রাবাসে পেপার স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ছি আর মাঝে মাঝে টিভির দিকে তাকাচ্ছি। বসে টিভি দেখার মানসিকতা ছিল না, কারণ টিভি রিমোর্ট সিনিয়রদের হাতে থাকে সবসময়। সিনিয়রদের হাতে রিমোর্ট থাকলে কখনো একটি চ্যানেল ত্রিশ সেকেন্ডও স্থায়ী থাকে না। জুনিয়রদের রিমোর্ট ধরা তো দূরের কথা সামনের দুই তিন সারির আসনের আশেপাশে উঁকি মারাও নিষেধ। তাই পেছনের সর্বশেষ সারিতে জায়গা পেলে বসা আর না পেলে দাঁড়িয়ে টিভি দেখে দেখে সিনিয়রদের গালিগালাজ করা ছাড়া আমরা জুনিয়রদের আর কোন কাজ ছিল না। রাগ আর ক্ষোভ নিয়ে পেপার স্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে সিনিয়রদের টিভি চ্যানেল নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ উপভোগ করছি। এমন সময় হঠাৎ মনে হল টিভিতে চুনতি সীরত ময়দান ও শাহ সাহেব কেবলার মাজারের দৃশ্য। নিশ্চিত হওয়ার আগেই চ্যানেল পাল্টে গেছে। কিন্তু মনের মধ্যে ক্ষণিকের সে দৃশ্য যে ঢেউ জাগিয়েছে, তাতে আর স্থির থাকতে পারি নি। সরাসরি নিষিদ্ধ সারির সামনের দিকে রিমোর্ট হাতে সোফায় গা এলিয়ে পায়ে পা তুলে বসে থাকা বড়ভাইকে (সিনিয়র?) নিম্নস্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ভাইয়া এনটিভিতে আজ একটি ‘ইসলামী কুইজ’ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা, সেটা কি শেষ হয়ে গেছে? জুনিয়রদের কথা কানে নিতে নেই, তাই তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। পাশের জন জিজ্ঞেস করলেন, এটা আবার কী ধরনের অনুষ্ঠান? ‘ইসলামী কুইজ’অনুষ্ঠান একটা আছে নাকি? বললাম- আমি তো জানি না ভাইয়া, শুনেছি ‘ইসলামী কুইজ’অনুষ্ঠান দেখাবে, সেটা কীরকম তা জানার আগ্রহ ছিল তো!

‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’ জানা ছিল। কিন্তু ভাঁড়ের সামনে সত্য বলা মানে সত্যের অবমূল্যায়ন করা। তাই কিছুটা মিথ্যা বলেছিলাম। তার মনেও কৌতুহল জাগল হয়ত। সাথে সাথে চ্যানেল টিউন করা শুরু করলেন। টিউনিং থামল এনটিভিতে এসে। পর্দায় দেখতে পাচ্ছি নেজাত চাচা সাক্ষাতকার দিচ্ছেন। এক অজানা আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল মনে, আমাদের গ্রাম চুনতির দৃশ্য টিভিতে সম্প্রচার হতে দেখে। বড় ভাই বললেন, এ-তো কিসের সাক্ষাতকার দেখাচ্ছে! আমি বললাম, মনে হয়ে অনুষ্ঠানটা শেষ হয়ে গেছে! ততক্ষণে নেজাত চাচার সাক্ষাতকার শেষ হয়েছে। সীরত ময়দানের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। মাহফিলে আগত মেহমান, মেহমানখানা, খাবার লাইন, আপ্যায়ন, বাবুর্চিদের কাজকর্ম, স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততা ইত্যাদির চিত্র একের পর এক ভেসে আসছে। খাবার লাইনের বিশাল দৃশ্য দেখে কয়েকজন ‘ওয়াও’ করে উঠল। আমিও আস্তে আস্তে মনে মনে হাসতে হাসতে নিষিদ্ধ সারি ছেড়ে পেছনের লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গর্বে বুক ফুলে উঠল, মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। আমি শিহরিত, উৎফুল্ল মেজাজে আমার এক বন্ধুকে কানে কানে বললাম, ‘আমাদের এলাকার মাহফিল’!

দেখানো হচ্ছে কর্মীবাহিনীর চিত্র। কর্মীবাহিনীর প্রধান সহ স্বেচ্ছাসেবকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। হৈ হৈ করে উঠল টিভি দর্শক। কয়েকজন সিটিও বাজালো। এক বড়ভাই তো আলিফ লায়লার কেহেরমানের হাসি দিয়ে দিল। কয়েকজন হাততালি দিয়ে বিনোদনে সাড়া দিল।

কিন্তু টিভির দৃশ্য কি কোন কৌতুকের ছিল? না, কোন কৌতুকের ছিল না। সারিবদ্ধভাবে চেহারায় হুতুম পেঁচার রূপ নিয়ে দাঁড়ানো কয়েকজন কর্মীর পরিহিত পোশাক দেখে দর্শক হেসেছে। আমার বন্ধুটি নিরস মুখে আমার দিকে তাকালো, যাকে কানে কানে বলেছি -‘আমাদের এলাকার মাহফিল’। আমি আর কারো দিকে তাকাইনি। টিভির দিকে চোখ রেখে দিগন্তে দৃষ্টি প্রসারিত করে ভাবছি, দৃশ্যটি ধারণ করার সময় আমাদের গ্রামে একজন লোকও কেন ছিল না, যে বুঝিয়ে দিত ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো মানে শুধু তিনপায়া স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়ানো নয়; বরং সমগ্র বিশ্বের সামনে দাঁড়ানো! শ্রমরত অবস্থায় পরিহিত পোশাক নিয়ে কারো আপত্তি থাকে না, কিন্তু অবসর সাক্ষাতকারের ক্ষেত্রে পোশাক কিংবা মেকাপের কিছু বিষয় থাকে!

পরবর্তীতে ক্যামেরা বন্দীদের একজনকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আপনি গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি আলগা করে কেন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন? তিনি যে ভাষায় উত্তর দিলেন সেটা আমার অপরিচিত ছিল না, কিন্তু কাম্যও ছিল না। কারণ, সে ভাষা আমাদের গ্রামের সর্বজনীন ভাষা নয়, গুটি কয়েক ভদ্রজনের (স্বঘোষিত মুরব্বি?) ভাষা। তিনি পরিস্কার স্থানীয় ভাষায় বললেন, “আঁর এলাকাত আঁত্তু মনে হইলে লেন্ডা থাইক্যম, মনে হইলে লুঙ্গি ফইরগ্যম, মনে হইলে গুছ মাইরগ্যম, হাছ্- ...‘ডর (বিলুপ্ত ‘ছেঁ’) কী? আঁর এলাকার মাহফিল, আঁত্তু যেন মনে হয় এন গরি হাম গইরগ্যম -উপদেশ দইন্যা হন্?”

মনে মনে বললাম, “উপদেশ দেয় কে? এ-কাজ তো যার-তার নয়! এ-কাজের জন্য এলাকায় আপনারাই নির্দিষ্ট আছেন। উপদেশ তো আপনারাই দেন! প্রয়োজন হলেও দেন, না হলেও দেন!” এসব বিষয়ে কারো সাথে আলোচনার ক্ষেত্র নেই। তাছাড়া, আলোচনা কোন সমাধান নয়। মাঝে মাঝে মানসিক পীড়া অনুভব করি, হয়ত ব্যাতিক্রম দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। কখনো কখনো নিজেকে প্রশ্ন করি, তবে উত্তরের আশা করি না! যা উপলব্ধি করি, তার কণাও প্রকাশ করতে পারি না ভাষার দৈন্যতায়। অবাক লাগে কান্ডজ্ঞানহীন মন্তব্য নিয়ে। যেভাবে আমি আমার বন্ধুকে বলেছিলাম ‘আমাদের এলাকার মাহফিল’; মাহফিল কি আমাদের এলাকার?

অতীতের নথিপত্র উল্টালে হয়ত আরো স্পষ্ট হবে, সীরত মাহফিল যাত্রা লগ্ন থেকেই শুধু এই এলাকার লোক দ্বারা পরিচালিত ছিল না; বরং প্রতিবছর অনুদানের বিরাট অংশ বহিরাগত এবং যারা অনুদান দেন তারা কখনো দাবী করেন না যে, এটা আমাদের (ব্যক্তিগত/জাতীয়) মাহফিল! চুনতিতে অনুষ্ঠিত হয় বলে এটিকে চুনতির স্থানীয় অনুষ্ঠান ভাবার কোন সুযোগ নেই। দেশের যেকোন প্রান্তের লোক এই অনুষ্ঠান থেকে কিছু নিতে পারে এবং অনুষ্ঠানের জন্য কিছু দিতেও পারে।

সীরত অনুষ্ঠানকে দেশীয় বলারও সুযোগ নেই; এখানে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের আনাগোনা আছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর প্রভাবও আছে। চুনতি ডট কমের সহযোগীতায় সীরত অনুষ্ঠান ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে অনেক প্রবাসী এবং বিদেশি উক্ত অনুষ্ঠান উপভোগ করেছে। এভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সীরতের প্রভাব বিস্তার লাভের পরও কী বলব -এটি আমাদের এলাকার অনুষ্ঠান? ‘মক্কার হজ্ব’ এবং ‘মক্কায় হজ্ব’-এর মধ্যে যদি পার্থক্য থাকে, তাহলে ‘এলাকার মাহফিল’ এবং ‘এলাকায় মাহফিল’ এর মধ্যে কেন পার্থক্য থাকবে না? তাছাড়া যিনি এই অনুষ্ঠান প্রচলন করেছিলেন তিনি কি ‘এলাকার মাহফিল’ হিসেবে প্রচলন করেছিলেন?

তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মাহফিলে সীরতের অবস্থান স্থানীয় নাকি দেশীয়, কিংবা আন্তর্জাতিক তা না উপলব্ধি করতে না পারা খুবই বেদনাদায়ক এবং লজ্জাজনক। এর অবস্থান যে যেভাবেই গ্রহণ করুক, সেটা তার দৃষ্টিভঙ্গির ফল। কিন্তু যখন আমরা ক্যামেরার সামনে দাঁড়াব তখন ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি অক্ষুণ্ন রাখার কোন সুযোগ নেই, বিশেষ করে যদি তা কোন টেলিকাস্টিং মিডিয়ার ক্যামেরা হয়! অন্তত মিডিয়ার সামনে হলেও এরকম একটি আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠানের কর্মীদের আচরণ আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত। ক্যামেরার ল্যান্স দেখে পতঙ্গের আগুনে ঝাপ দেয়ার মত নিজেদের অস্তিত্বের কথা ভুলে গিয়ে ক্যামেরায় বন্দী হয়ে শুধু শুধু বিনোদনের খোরাক হয়ে কী লাভ? মনে রাখা উচিত, ক্যামেরায় বন্দি হয়ে আপনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সীরত কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। নিঃসন্দেহে আপনার ব্যক্তিত্ব আয়োজকদের প্রতিনিধিত্ব করবে। আপনি হয়ত বলতে পারেন, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর জন্য আবার সূত্র শিখতে হবে নাকি? আমি তার উত্তর দেব না। পরিবর্তে বলব, লৌকিক জ্ঞানের (common Sense) কোন নির্দিষ্ট মানদন্ড নেই।