Writers Column



হযরত চুনতী শাহ সাহেব ও মাহফিলে সীরতুন্নবী (স.)


হযরত চুনতী শাহ সাহেব ও মাহফিলে সীরতুন্নবী (স.)



আহমদুল ইসলাম চৌধুরী





“হাম মাজারে মুহাম্মদ (স.) পে মর জায়েঙ্গে

জিন্দেগি মে ইয়েহি কাম কর জায়েঙ্গে”



যিনি সারা জীবন নবী পাক (স.)-এর শানে উক্ত বাক্য রাত দিন পড়ে গেছেন তিনি হলেন হযরত শাহ সাহেব (রহ.) চুনতী। যিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের চুনতীতে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন তিনি হলেন মহান আশেকে রাসূল হযরত আলহাজ্ব শাহ্ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.) প্রকাশ হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের বিখ্যাত জমিদার পরিবারের নাতি। ছিলেন আলেমেদ্বীন। চট্টগ্রাম দারুল-উলুম মাদরাসার কৃতি ছাত্র। তাঁর দাদা হযরত কাজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ আলী (রহ.)। আরাকানে বিশাল জমিদারী ছিল। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে এ মহান জমিদার হজ্বে গমন করলে সেখানে ইন্তেকাল করেন। ফলে তাঁর প্রথম পুত্র তথা শাহ সাহেব (রহ.)’র জেঠা হযরত মাওলানা ফয়েজ আহমদ (রহ.) পিতার জমিদারী এস্টেট দেখাশোনা করতে আরাকানে যাতায়াত করতেন। তিনি আরাকানে ভারতের উত্তর প্রদেশের হযরত হাফেজ হামেদ হাসান আলভী (রহ.) প্রকাশ আজমগড়ী হযরতের কাছে তরীকতে দাখিল হন। এরপর থেকে আজমগড়ী হযরত বছরে একবার নদী পথে পরবর্তীতে রেল চালু হলে দোহাজারী হয়ে চুনতী গমন করতেন তরীকতের খেদমত করতে। চুনতী ইউসুফ মঞ্জিলে তাশরীফ রেখে নিকটতম এলাকায়ও সফর করতেন।



হযরত শাহ সাহেব (রহ.) ১৯৩৬-৩৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে আরাকানে পিতার জমিদারী এস্টেটের দিকে গমন করলে সেখানকার ভামুর জামে মসজিদে অবস্থানরত অবস্থায় শবে কদরের রাত পান। এতে মহান আল্লাহপাকের তজল্লিতে নিজেকে নিজে আত্মহারা হয়ে যান। হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.) আরাকানে আল্লাহ পাকের প্রেমে রাসূল (স.) প্রেমে নিজেকে নিজে আত্মহারা হয়ে যাওয়ার সংবাদ চুনতীতে আসলে তাঁর সহোদর ভাই দেশ থেকে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসেন।



এদিকে আজমগড়ী হযরত চুনতীর ইউসুফ মঞ্জিলে তথা শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)’র বাড়িতে তশরীফ নিলে হযরত শাহ সাহেব (রহ.)’র অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে বলেন, “তোমরা তাঁকে ছেড়ে দাও। বেঁধে রাখতে হয় এ রকম পাগল তিনি নন, এক সময় তোমরা বুঝতে পারবে। ১৯৩৬/৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে দীর্ঘ ২০/২৫ বছর তিনি সাংসারিক জীবন ত্যাগ করে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (স.) প্রেমে মাতওয়ারা হয়ে পাহাড়ে পর্বতে, বনে-জঙ্গলে, নদীতে, অলিতে-গলিতে, শহরে-বন্দরে, শীতে-গরমে, ঝড়ে-বৃষ্টিতে, তুফানে, অন্ধকারে আল্লাহর যিকর করে এবং হযরত রসূলে করিম (স.) এর প্রশংসা করে বেড়াতেন এবং তাঁর মুখে সব সময় একটি বাক্য সার্বক্ষণিক পড়তে দেখা যাচ্ছিল। তা হল



“হাম মাজারে মুহাম্মদ (স.) পে মর জায়েঙ্গে

জিন্দেগি মে ইয়েহি কাম কর জায়েঙ্গে”



এ অবস্থায় প্রথম দিকে লোকজন তাঁকে শতভাগ উন্মাদ মনে করছিলেন। কিন্তু বেয়াদবির পরিণাম ভোগ করা এবং নানান করামত প্রকাশ পেতে থাকায় তাঁর প্রতি মানুষের পরিবর্তন এসে যায়। পর্যায়ক্রমে চতুর্দিকে হযরত শাহ কেবলা (রহ.) যে একজন মহান আশেকে রসূল (স.) আল্লাহ পাকের জিন্দা অলি তা বুঝতে পেরে মানুষ পর্যায়ক্রমে তাঁর প্রতি ধাবিত হতে থাকে। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি পর্যায়ক্রমে অনেকটা স্বাভাবিক হালতের দিকে চলে আসতে থাকেন। পৈত্রিক ঘর থেকে কিছুটা দূরত্বে তাঁর মহৎপ্রাণ স্ত্রীর সহযোগিতায় নতুন ভিটায় মাটির ঘর নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন একপুত্র ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে। পরবর্তীতে তাঁর আশেকগণ এ মাটির ঘরকে দালানে পরিণত করে দেন, যা সর্বমহলে শাহ মঞ্জিল হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯৭০-১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ ৬ বার হজ্বব্রত পালন করেন।



তাঁর জীবনের অন্যতম করামত হল মাহফিলে সীরতুন্নবী (স.)। যতটুকু মনে পড়ে দেশ পেরিয়ে বিশ্বের বুকে আল্লাহ পাকের হাবীব (স.)-এর শানে বাৎসরিক ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিলের প্রবর্তন মনে হয় চুনতীতে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসে শাহ মঞ্জিলের দক্ষিণ সংলগ্ন প্রায় ২ একর জমির ওপর একদিন ব্যাপী মাহফিলে সীরতুন্নবী (স.) চালু করেন। এতে তাঁর অন্যতম সহায়ক শক্তি ছিলেন নাজেমে আলা হযরতুল আল্লামা ফজলুল্লাহ (রহ.)। পরের বছর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসে তিন দিন মতান্তরে দুই দিন এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ৫ দিন, ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ১০ দিন, ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ১২ দিন, ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ১২ দিন, ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ১৫ দিন, কিন্তু শাহ সাহেব কর্তৃক ২ দিন বাড়িয়ে ১৭ দিন, আবার আরও ২ দিন বাড়িয়ে ১৯ দিনে গিয়ে মাহফিল অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। ১৯৮০-১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৯ দিন ব্যাপী সীরতুন্নবী (স.) মাহফিল উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.) ইন্তেকাল করলে পরবর্তী বছর তাঁর ভক্ত মহলে একটানা ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিল চালু রাখা এতে ব্যয়, শ্রম ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হযরত শাহ সাহেব প্রবর্তিত ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিল উদযাপন করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। সর্ব মহলে প্রশ্ন জাগে এ দীর্ঘ টানা ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিল উদযাপন কতটুকু সফল হবে? কিন্তু মহান এ আশেকে রসূল হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)’র অন্যতম করামত যে তিনি ইন্তেকাল করে গেছেন ৩৩ বছর আগে তারপরও প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯ দিন ব্যাপী এ মাহফিল সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মহান আশেকে রসুলগণ অর্থ প্রেরণ করে আসছেন এ মাহফিলের উদ্দেশ্যে।



১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে মাহফিলে সীরতুন্নবী (স.) শুরু হয়ে ২/৩ দিন বছর যেতে না যেতে মাহফিলে সমাগম অত্যধিক বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত শাহ্ মঞ্জিলের পশ্চিম পাশে পাহাড় সমেত বিশাল এলাকা খরিদ করতে আশেকে রসুলগণ মনোযোগী হন। এতে মাহফিলে সীরতুন্নবীর ময়দান খরিদে এগিয়ে আসেন মহান দাতা আশেকে রসুল ছালেহ  গ্র“প অব ইন্ডাস্ট্রিজ এর প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব ছালেহ আহমদ চৌধুরী। প্রায় ১২ একর ৮০ শতক তথা ৩২ কানি বিশাল এরিয়া খরিদে তিনি ভূমিকা রাখেন। শহর থেকে বুলডোজার দিয়ে পাহাড় কেটে সমতল করে সীরাত ময়দান প্রস্তুত করা হয়। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখানে মাহফিলে সীরতুন্নবী (স.) উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.) ইন্তেকাল করলে এ বিশাল সীরাত ময়দানের পশ্চিম-দক্ষিণ পার্শ্বে তাঁকে শায়িত করা হয়। এর সামান্য উত্তরে নির্মাণ করা হয় প্রকাণ্ড মসজিদ। হযরত শাহ সাহেব (রহ.) মসজিদের নামকরণ করেন বায়তুল্লাহ। এ প্রকাণ্ড মসজিদ ও শাহ্ সাহেব কেবলা (রহ.)’র মাজার নির্মাণে ব্যাপক অবদান রাখেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত শিল্পপতি আশেকে রসুল, বিশিষ্ট দানবীর, আলহাজ্ব মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া।



সীরাত ময়দান মসজিদে বায়তুল্লাহ নির্মাণসহ হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)’র জীবদ্দশায় বর্তমানেও হযরত শাহ সাহেব কেবলার ভক্তগণ আর্থিক ও শারীরিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন। এ মাহফিলে সীরতুন্নবী ময়দানে মসজিদে বায়তুল্লায় বাৎসরিক আরও উদযাপিত হয় ২৬ রজব দিবাগত রাত শবে মেরাজ, শাবানের ১৫ তারিখ রজনীতে লায়লাতুল বরাত, রমজানের ২৭ তারিখ লায়লাতুল কদর, ১০ মহরম আশুরা দিবস, ১১ রবিউসসানি ফাতেহায়ে এয়াজদাহম প্রতি বছর যথাসময়ে উদযাপিত হয়ে আসছে। হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)’র ইন্তেকালের পর প্রতি বছর সফর মাসের ২৩ তারিখ বৃহত্তর পরিসরে হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)-এর ইছালে সওয়াব মাহফিলও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।



আরাকান মহাসড়ক থেকে প্রায় ১ কিলোমিটারের কম দূরত্বে বিশাল সীরত ময়দান তার একপার্শ্বে মসজিদে বায়তুল্লাহ ও শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)’র  মাজার, পূর্বপার্শ্বে শাহ্ মঞ্জিল, উত্তর পার্শ্বে পূর্ব দিকে হাকিমিয়া কামিল মাদরাসার অবকাঠামো, পশ্চিম দিকে মাহফিলে সীরতের অবকাঠামোর নয়নাভিরাম দৃশ্য যা দেশের গ্রামা লে দেখা মেলা ভার। এসব কিছু হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রহ.)’র অবদান ও স্মৃতি বহন করে চলেছে।


Comments

Leave a Replay

Make sure you enter the(*)required information